নির্বাচনী অচলাবস্থা: সরকার গঠনে কোন পথে এগোবে ইসরায়েল?
ইসরায়েলের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার পরও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারছেন না প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের গাদি আইজেনকোটও। ফলে দেশটিতে সরকার গঠন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক দর-কষাকষি শুরু হতে যাচ্ছে। আরব দলগুলোর ঐতিহাসিক সাফল্য, ডানপন্থী দলগুলোর অবস্থান এবং সম্ভাব্য জাতীয় ঐক্যের সরকার—এসব সমীকরণ ভেদ করে সরকার গঠন করতে কোন পথে এগোতে পারে ইসরায়েল।
বুধবার (২৯ অক্টোবর) আল জাজিরার প্রতিবেদন জানিয়েছে, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ১২০ আসনের পার্লামেন্টে ৫৩টি আসন পেয়ে এখনও এগিয়ে রয়েছে। আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের আসন সংখ্যা ৪৮। আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি। এদিকে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। ফলে কোন শিবিরই এখন পর্যন্ত এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি।
এগিয়ে থেকেও সরকার গঠন অনিশ্চিত নেতানিয়াহুর:
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোন দলকে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে হয় না। বিভিন্ন দল জোট গঠন করে সরকার পরিচালনা করে। তবে নতুন সরকারকে পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে হয়। এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার মিত্ররা সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শিবির হিসেবে উঠে আসছে। কিন্তু তাদের সম্ভাব্য ৫৩টি আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে আটটি কম। অন্যদিকে আইজেনকোটের শিবিরের ৪৮টি আসনও যথেষ্ট নয়।
এখানেই তৈরি হয়েছে নির্বাচনী অচলাবস্থা। নেতানিয়াহু চাইলে বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দলকে নিজের পক্ষে টানতে পারেন। একইভাবে আইজেনকোটকে সরকার গঠন করতে হলে আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া অথবা বিরোধী শিবিরের বাইরে থাকা অন্য কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে। তবে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি দুই পক্ষের জন্যই বড় বাধা। নেতানিয়াহুর বিরোধী অনেক নেতা তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর অঙ্গীকার করেছেন। আবার বিরোধী শিবিরের অধিকাংশ ইহুদি দল আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের সরকার:
সরকার গঠনের একটি সম্ভাব্য পথ হলো জাতীয় ঐক্যের সরকার। এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু বিরোধী শিবিরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে নিজের সরকারে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারেন। এর জন্য তাঁকে বর্তমান জোটের কট্টর ডানপন্থী ও অতি-রক্ষণশীল দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
এই সমীকরণে আইজেনকোট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তবে তিনি নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন এবং বর্তমান সরকার পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে যোগ দেওয়া তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ঐক্যের সরকার গঠন করতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত কোনো ফল নয়। নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের শরিকদের ধরে রাখা এবং বিরোধী নেতাদের রাজি করানো—দুটি কাজ একসঙ্গে করা কঠিন হতে পারে।
আরব দলগুলোর সমর্থনে বিরোধী সরকার:
এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ১৯টি আসন তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। এই আসনগুলো বিরোধী শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হলে কাগজে-কলমে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অতিক্রম করা সম্ভব। তবে বাস্তবে এই সমীকরণ তৈরি করা সহজ নয়। আইজেনকোটসহ বিরোধী শিবিরের অধিকাংশ ইহুদি দল আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। আবার আরব দলগুলোর মধ্যেও সরকারে সরাসরি যোগ দেওয়া এবং বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
আল–জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন বিরোধী সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন, তবে সরকারে সরাসরি যোগ দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের অবস্থান আলাদা। অন্যদিকে ইউনাইটেড আরব লিস্ট সরকার গঠনের আলোচনায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো সরকারকে সমর্থন দেওয়া মানেই সেই সরকারের অংশ হওয়া নয়। আরব দলগুলো সরাসরি মন্ত্রিসভায় যোগ না দিয়েও নির্দিষ্ট শর্তে সরকার গঠনে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, সামরিক নীতি ও আরব নাগরিকদের অধিকার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে এমন সমঝোতা কতটা স্থায়ী হবে, তা অনিশ্চিত।
বিরোধী শিবিরের ডানপন্থীদের দলে টানা:
নেতানিয়াহু বিরোধী শিবিরের ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টাও করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নাফতালি বেনেট ও অ্যাভিগদর লিবারম্যানের মতো নেতারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিতে তাঁদের সঙ্গে নেতানিয়াহুর কিছু মিল থাকলেও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। বেনেট ও লিবারম্যান দুজনই নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের প্রশ্নেও তাঁদের অবস্থান নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের শরিকদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তাই এ ধরনের জোট গঠনের জন্য শুধু আসনসংখ্যার হিসাব যথেষ্ট নয়; নীতিগত বিরোধও মেটাতে হবে। বিরোধী শিবির থেকে কয়েকটি দল নেতানিয়াহুর পক্ষে চলে গেলে তাঁর সরকার গঠনের পথ সহজ হতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভেঙে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সংশ্লিষ্ট নেতাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে।
আবারও নির্বাচন:
রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ইসরায়েলে নতুন নির্বাচন হতে পারে। তবে তার আগে সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। আল–জাজিরা ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন। এরপর যাঁর সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে নির্ধারিত নিয়মে অন্য নেতাও চেষ্টা করার সুযোগ পেতে পারেন। সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের পথ খুলবে।
নতুন নির্বাচন নেতানিয়াহুর জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে, আবার বিরোধী শিবিরের জন্যও নতুন সুযোগ আনতে পারে। আরব ভোটারদের উচ্চ অংশগ্রহণ পরবর্তী নির্বাচনেও বজায় থাকবে কি না, ডানপন্থী ভোটাররা আরও সংগঠিত হবেন কি না এবং ছোট দলগুলোর ভোট কোন দিকে যাবে—এসব বিষয় ফল বদলে দিতে পারে। তবে নতুন নির্বাচন হলে নেতানিয়াহু সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারাবেন, এমন নয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
আরব ভোটারদের সাফল্য!
এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ১৯টি আসন শুধু আসনসংখ্যার বিষয় নয়; এটি ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বেরও গুরুত্বপূর্ণ দিক। আরব জনগোষ্ঠী দেশটির জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। তাদের ভোটের উপস্থিতি সরকার গঠনের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে এই প্রতিনিধিত্ব সরাসরি নীতিগত পরিবর্তন নিশ্চিত করে না। আরব দলগুলো সরকারে অংশ নেবে কি না, অন্য দলগুলো তাদের সমর্থন গ্রহণ করবে কি না এবং পার্লামেন্টে কোন ইস্যুতে সহযোগিতা সম্ভব হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। এদিকে লিকুদ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলটি অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করেনি। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের নির্বাচনের তুলনায় অনিয়মের অভিযোগ কম এসেছে। ফলে এ অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না।
কী সিদ্ধান্ত নিবে সরকার?
নেতানিয়াহুর শিবির সবচেয়ে বড় জোট হলেও সরকার গঠনের নিশ্চয়তা নেই। আইজেনকোটের বিরোধী শিবিরেও আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। ফলে জাতীয় ঐক্যের সরকার, আরব দলগুলোর সমর্থনে বিকল্প সরকার, ডানপন্থী দলগুলোর নতুন সমীকরণ এবং নতুন নির্বাচন—এসব পথই আলোচনায় রয়েছে।
একইসঙ্গে পরবর্তী কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আনুষ্ঠানিক ভোটের ফল, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দলগুলোর আলোচনা, ছোট দলগুলোর অবস্থান এবং নেতানিয়াহু বা আইজেনকোটের পক্ষে কতজন আইনপ্রণেতা সমর্থন দিতে রাজি হন।
ফলে নির্বাচনে এগিয়ে থাকা আর সরকার গঠন করা এক বিষয় নয়। নেতানিয়াহু সবচেয়ে বড় শিবিরের নেতা হিসেবে প্রথম সুযোগ পেতে পারেন, কিন্তু তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন জোগাড় করতে হবে। অন্যদিকে আইজেনকোটের সামনেও রয়েছে আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এবং নিজ শিবিরের ঐক্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। চূড়ান্ত ফল ও জোট আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কার নেতৃত্বে হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা ও এপি