ইসরায়েলে নির্বাচন: ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষেও স্পষ্ট জয় পায়নি কেউ
ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে এখন পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এদিকে বিরোধী জোটও প্রয়োজনীয় আসন পায়নি। ফলে নির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট জয় নিশ্চিত করতে পারেনি। খবর আল জাজিরার।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৯টা পর্যন্ত দেশটির ৫০ লাখ বেশি ভোট গণনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট এখন পর্যন্ত ৫৩টি আসন। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।
ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য পার্লামেন্টে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে দুই জোটের কেউই এখন পর্যন্ত সরকার গঠনের মতো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা নাগাদ আসনসংখ্যার চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। তবে ফল প্রকাশের পরও সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ আরব দলগুলো
নির্বাচনে আরবদের সমর্থনপুষ্ট জয়েন্ট লিস্ট ও রা'আম—এই দুই দল বা জোট এখন পর্যন্ত ১৯টি আসন পেয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফল পরিবর্তিত হতে পারে। এবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জয়েন্ট লিস্টের দাবি, আরব ভোটারদের ভূমিকার কারণে নেতানিয়াহু ও তাঁর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। তবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন জানিয়েছেন, ‘নেতানিয়াহু সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে তারা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে তার জোট বিরোধীদের নেতৃত্বাধীন সরকারে সরাসরি যোগ না দিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।’ অন্যদিকে নির্বাচনের আগে আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের কথা নাকচ করেছিলেন। নেতানিয়াহুও এমন সরকারের বিরোধিতা করেছেন। ফলে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা বেশি হলেও সরকার গঠনের সমীকরণ সহজ হবে না।
আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভোট কারচুপি’র অভিযোগ নেতানিয়াহুর
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি অভিযোগ করেছে, আরব দলগুলো নির্বাচনে অনিয়মের মাধ্যমে ফল প্রভাবিত করেছে। দলটির দাবি, আরব অধ্যুষিত কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা, জালিয়াতি ও নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো ঘটনা ঘটেছে। লিকুদ জানিয়েছে, এসব অভিযোগের পক্ষে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পুলিশ, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া হবে।
এদিকে জয়েন্ট লিস্ট বলেছে, আরব ভোটাররা ভয়ভীতি ও উসকানির জবাব ভোটের মাধ্যমে দিয়েছেন। দলটি ঘরবাড়ি ভাঙা, বর্ণবাদ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলে নেতানিয়াহু সরকারের নীতির বিরোধিতা করেছে।
ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভবনা কতটুকু
নেতানিয়াহুর জোট সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে—এমন পূর্বাভাসের ভিত্তিতে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি বিরোধী নেতা আইজেনকটকে নিয়ে একটি ঐক্য সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। তবে এ ধরনের সরকার গঠনের সম্ভাবনা এখনো নিশ্চিত নয়। ইসরায়েলের রাজনীতিতে জোট সরকার গঠন স্বাভাবিক ঘটনা। দেশটির ইতিহাসে কোনো দল এককভাবে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে পারেনি। তাই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও অন্য দলের সমর্থন ছাড়া নেতানিয়াহুর পক্ষে সরকার গঠন কঠিন হতে পারে।
এদিকে এখনো পাঁচ লাখের বেশি বিশেষ ব্যালট গণনা বাকি রয়েছে। এসব ভোটের মধ্যে সেনাসদস্য, কূটনীতিক এবং নিজ নিজ নিবন্ধিত ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের ব্যালট রয়েছে। এগুলো গণনার পর আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে।
নির্বাচনের ফলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলে এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। গাজায় যুদ্ধ এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত এ ভোটকে তার দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রিত্বের ওপর জনসমর্থনের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৭৭ বছর বয়সি নেতানিয়াহু এখনো রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। তবে তাঁর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠনের জন্য নতুন করে রাজনৈতিক সমঝোতা করতে হবে।
নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর আগামী সপ্তাহে দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবেন। এরপর সরকার গঠনের জন্য উপযুক্ত দল বা জোটকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোবে।
হারজগ সব দলকে নতুন নির্বাচন এড়িয়ে সরকার গঠনের পথ খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, আবার নির্বাচন হলে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যেতে পারে। চূড়ান্ত ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনা এখন নির্ধারণ করবে, নেতানিয়াহু আবারও সরকার গঠন করতে পারবেন, নাকি ইসরায়েলে ক্ষমতার পালাবদলের পথ তৈরি হবে।