নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ইরানে হামলা করতে চেয়েছিলেন নেতানিয়াহু, চাঞ্চল্যকর নথি ফাঁস
৭ অক্টোবর থেকে গাজায় আগ্রাসন শুরুর পর মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইসরায়েলে। এরই মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। তবে দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বাধায় শেষ পর্যন্ত ইরানের হামলার সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন নেতানিয়াহু। পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে তেল আবিবের সামরিক পদক্ষেপের এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।
প্রতিবেদনে তিনজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এবং আলোচনা সম্পর্কে অবগত আরও তিনজনের বরাতে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে নতুন করে বিমান হামলার পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন নেতানিয়াহু। তবে সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির এতে আপত্তি জানান।
এমন খবর সামনে এসেছে নেতানিয়াহু সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে মতবিরোধের অভিযোগ অস্বীকার করার পর। সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেন, ইরান ইস্যুতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে মতপার্থক্যের দাবি ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা’। দুই পক্ষের মধ্যে পূর্ণ সমন্বয় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা ইসরায়েলের নেই বলেও জানান কাটজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানোর বিরোধিতা করেন জামির। তার যুক্তি ছিল, এ ধরনের অভিযানের জন্য তাৎক্ষণিক বা জরুরি সামরিক প্রয়োজন নেই। সামরিক বাহিনীর প্রধানের পাশাপাশি বিমানবাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল ওমর তিশলারও হামলার সময় নিয়ে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং ভোটের আগে অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তা জনগণকে বোঝানোর জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তবে জামির নীতিগতভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধী ছিলেন না। আপত্তি ছিল মূলত প্রস্তাবিত সময় নিয়ে। ইসরায়েলি এক কর্মকর্তা ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেক ব্যক্তির বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে এমন একটি পৃথক অভিযানের জন্য চাপ দিচ্ছেন বলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন জামির, যা সরাসরি বা প্রকাশ্য হামলার পর্যায়ে পড়বে না। তবে ওই অভিযানের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। জামির আশঙ্কা করেছিলেন, এমন পদক্ষেপের জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালাতে পারে এবং পরিস্থিতি বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের অভিযানের সিদ্ধান্তগুলো নিরাপত্তা বিবেচনা ও জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। নির্বাচনের আগে হামলার জন্য নেতানিয়াহুর চাপ দেওয়ার কারণ কী ছিল, তা স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমটির মন্তব্যের অনুরোধে নেতানিয়াহুর কার্যালয় তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।
ইরান নিয়ে নেতানিয়াহু ও জামিরের মধ্যে বিরোধের খবর প্রথম সামনে আসে রবিবার (২৫ অক্টোবর)। ইসরায়েলী গণমাধ্যম সুত্রে জানা গেছে, ইরান-সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্দেশনাটি বাস্তবায়নের আগে বিস্তারিত আলোচনা, আইনি নিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের স্বাক্ষর চেয়েছিলেন জামির। সংঘাতকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে—সামরিক বাহিনীর ভেতরে এমন উদ্বেগের কথাও জানানো হয়।
নেতানিয়াহু এ অভিযোগকে ‘আবর্জনা’ বলে উড়িয়ে দেন। অন্যদিকে কাটজ বলেন, নির্বাচনের আগে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইরান ইস্যুতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে পূর্ণ সমন্বয় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে আবার সংঘাত শুরু হলে তা ইসরায়েলে সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনে ভালো ফল করলেও নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর পক্ষে সরকার গঠন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে নতুন সংঘাতের পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এগুলো সম্ভাবনা মাত্র; এমন কোনো পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে বা এ ধরনের পরিস্থিতি অবশ্যম্ভাবী—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন। জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট কিংবা সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট—কোনোটিরই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত নয় বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনের পর সরকার গঠনে জোট আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইরানে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান সোমবার (২৬ অক্টোবর) জানান, রাজনৈতিক কারণে প্রধানমন্ত্রী দেশকে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কি না, তা তদন্ত করতে তিনি ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে আবেদন করেছেন।
লিবারম্যানের অভিযোগ, নেতানিয়াহু নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এমন পদক্ষেপ নিতে চাপ দিচ্ছিলেন, যা বিপজ্জনক ভুল হিসাবের কারণ হতে পারত। নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কায় যুদ্ধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে তা দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। বামপন্থী নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকট জামিরের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। নেতানিয়াহু সরকারও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে মতবিরোধের খবর প্রত্যাখ্যান করেছে।
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু নিজেকে ইরান ও দেশটির আঞ্চলিক মিত্রদের মোকাবিলায় সবচেয়ে উপযুক্ত নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বারবার বলেছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্য অর্জন সম্পন্ন করা প্রয়োজন। বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) নেতানিয়াহু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে তেল আবিবের ওপর পারমাণবিক বিস্ফোরণের মেঘ দেখা যায়। এর মাধ্যমে তিনি ইরানের কথিত অস্তিত্বগত হুমকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেন। নির্বাচন বানচাল করতে ইরান ও তাদের সহযোগীরা হামলার চেষ্টা করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইসরায়েলের নির্বাচনে কে বিজয়ী হলেন, তা নিয়ে তেহরানের বিশেষ কিছু যায় আসে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রোববার নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তাকে যুদ্ধকালীন অসাধারণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন ট্রাম্প।
নির্বাচনের দিন ভোটাররা যখন ব্যালট দিচ্ছেন, তখন ইরানে হামলার প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধ, নিরাপত্তা নিয়ে ব্যর্থতার অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অবস্থান তাকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করবে, নাকি এ বিতর্ক নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবিকে জোরালো করবে, তা এখন দেখার বিষয়।
একই সঙ্গে ইসরায়েলের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ইরানের সঙ্গে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয় কি না, তা নিয়েও আঞ্চলিক উদ্বেগ রয়েছে। আপাতত ইরানে হামলার প্রস্তাব, সামরিক কর্মকর্তাদের আপত্তি এবং সরকারের অস্বীকৃতি—সবই এমন কিছু আলোচনার পরস্পরবিরোধী বিবরণ, যার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।