২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:২০

নেতানিয়াহু হারলে গাজাবাসীদের ভাগ্য কী বদলাবে

ইসরায়েলের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করেন গাজার বাসিন্দারা  © সংগৃহীত

৩ বছর ধরে চলা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন গাজার ফিলিস্তিনিরা। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকলেও প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলের বিমান হামলা, চরম দুরবস্থা ও অবরোধের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে ভুগছেন তারা।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলিরা নতুন সরকার নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। গাজায় যুদ্ধ এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। তার সরকারের উগ্র ডানপন্থি সদস্যরা গাজা নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি উপত্যকাটির বাসিন্দাদের বিতাড়িত করারও দাবি তুলেছেন তারা।

এ কারণে ইসরায়েলের নির্বাচনকে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন গাজার বাসিন্দারা। নির্বাচনী প্রচারও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন অনেকে। উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ এলিয়ান এখন পাঁচ সন্তানকে নিয়ে দেইর আল-বালাহ এলাকায় বসবাস করছেন। তার আশা, ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে বারবার বাস্তুচ্যুতি ও যুদ্ধের শিকার ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ কিছুটা কমতে পারে।

তিনি বলেন, ‘পরবর্তী পর্যায়ে কে জয়ী হন, তা দেখতে আমরা ইসরায়েলের নির্বাচন অনুসরণ করছি। আমরা আশা করি, ফিলিস্তিনিদের স্বার্থে এবং আমাদের মতো যারা আবারও বাস্তুচ্যুত হয়েছি, তাদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হতে পারে।’

ইসরায়েলের সাবেক সামরিক প্রধান ও নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের জয়ের প্রত্যাশা করছেন এলিয়ান। তার মতে, নেতানিয়াহু তুলনামূলকভাবে বেশি কঠোর অবস্থানের অনুসারী। লিকুদ পার্টি ও উগ্র ডানপন্থি মিত্ররা আবারও ক্ষমতায় এলে গাজায় যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

এলিয়ান বলেন, ‘আমরা আশা করি, নির্বাচনের পর পরিবর্তন আসবে এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কেউ জয়ী হবেন। ৭ অক্টোবরের আগে ও পরে ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে নেতানিয়াহু যা করেছেন, তা সামান্য কিছু নয়।’

তবে নির্বাচনে যে পক্ষই জয়ী হোক না কেন, ইসরায়েলের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন না তিনি। এলিয়ান বলেন, ‘তারা এখনো আমাদের শত্রু। পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি হবে বলে আমি আশা করি না। তবে আমরা আশা করি, অন্য কেউ এলে তিনি নেতানিয়াহুর চেয়ে কম কঠোর হবেন।’

ইসরায়েলের পরবর্তী নেতার প্রতি যুদ্ধ বন্ধ, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও অনাহার ঠেকানো এবং গাজার সীমান্ত ক্রসিংগুলোর ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এলিয়ান বলেন, ‘আমরা চাই, ইসরায়েলের নেতৃত্বে যিনিই আসুন, তিনি যেন কঠোর অবস্থান না নেন। যুদ্ধ বন্ধ করুন এবং আমাদের শান্তিতে বাঁচতে দিন।’

ইসরায়েলি নীতিতে পরিবর্তন নিয়ে সংশয়

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ৪১ বছর বয়সী ইসলাম সালেম তিন মেয়েকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ইসরায়েলের নির্বাচন ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছেন তিনি। তার ধারণা, নির্বাচনের ফল গাজার ভবিষ্যৎ ও তাঁর সন্তানদের জীবনে প্রভাব ফেলবে, যদিও সেই প্রভাব ইতিবাচক না-ও হতে পারে।

সালেম বলেন, ‘রাজনীতিই আমাদের জীবিকা। এটি আমাদের জীবনের সবকিছুর সঙ্গে জড়িত—জীবনযাত্রার পরিস্থিতি, এমনকি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের সঙ্গেও।’

তবে তার মতে, নির্বাচন মূলত ইসরায়েলের স্বার্থকে কেন্দ্র করেই অনুষ্ঠিত হয়। তাই নতুন মুখ সরকারে এলেও গাজা নিয়ে দেশটির কৌশল অপরিবর্তিত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

সালেম আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের নীতিতে কোনোভাবেই পরিবর্তন আসবে না। তারা যা দখল করে, সেটাকেই নিজেদের বলে মনে করে এবং একে রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচনা করে। দীর্ঘদিন ধরে তারা যে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, এটিকে সেই যুদ্ধের অর্জন হিসেবে দেখে।’

গাজার ‘ইয়েলো লাইন’-এর ভেতরে প্রায় ৬৫ শতাংশ ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন সালেম। উপত্যকাটিতে পুনর্গঠনকাজ শিগগির শুরু হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সালেম বলেন, ‘আমার মনে হয়, পুনর্গঠন কঠিন হবে। তারা অন্যদের কোনো অধিকার দিতে চায় না। তারা নিজেদের অধিকার পুরোপুরি, এমনকি তার চেয়েও বেশি চায়।’

বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে তার জন্য।

সালেম বলেন, ‘ভয় পাওয়ার মতো কোনো ভবিষ্যৎ আর আমাদের অবশিষ্ট নেই। আমরা প্রতিদিনের দিন প্রতিদিন পার করছি। এরপর কী ঘটবে, তা আমাদের জানা নেই। আমরা যা কিছু নিয়ে ভয় পেয়েছিলাম, তার সবই ইতিমধ্যে ঘটে গেছে।’

ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীকে কী বলবেন—এমন প্রশ্নে গাজার মানুষের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন তিনি। সালেম বলেন, ‘যদি একজন সাধারণ মানুষ তার কাছে গিয়ে বলতে পারতেন, আমাদের ছেড়ে দিন। আমাদের একটু স্বস্তিতে থাকতে দিন, একটু শ্বাস নিতে দিন। কিন্তু তিনি তা বুঝতে চাইবেন না। তাকে আর কী বলব?’

১২ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েও নিরাপত্তাহীনতায় হানান

গাজায় যুদ্ধের সময় ১২ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৫৭ বছর বয়সী হানান আবু আল-মাজা। অবরুদ্ধ উপত্যকাটির মানুষের জন্য ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার আরও দুর্ভোগ বয়ে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

হানান বলেন, ‘আমরা ভয় ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি বলেই নির্বাচন অনুসরণ করি। আমাদের ১২ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। আমরা ভয় পাচ্ছি, তারা আমাদের সঙ্গে আগের চেয়েও খারাপ কিছু করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিরাপদ বোধ না করেই ঘুমাতে যাই। ভাবতে থাকি, পরবর্তী সময়ে তারা আমাদের সঙ্গে কী করতে পারে। ভয় এখনো আমাদের মাথা ও হৃদয়ে রয়ে গেছে।’

নেতানিয়াহু পরাজিত হলে বেইত লাহিয়ায় নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে বলে আশা করেন হানান। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, অন্য কেউ জয়ী হবেন। তাহলে আমরা মানসিক শান্তি পাব, নিরাপদ বোধ করব এবং নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারব। এটাই আমাদের চাওয়া।’

গাজায় বছরের পর বছর ধরে চলা ধ্বংসযজ্ঞের পর ইসরায়েলের পরবর্তী নেতার কাছ থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল আচরণ প্রত্যাশা করেন তিনি। হানান বলেন, ‘হয়তো তিনি বলবেন, গাজায় আর কিছু অবশিষ্ট নেই, তারা যথেষ্ট করেছে, এবার মানুষকে বাঁচতে দেওয়া উচিত। গাজায় এমনিতেই আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই, যা নিয়ে আরও কিছু করার কথা কেউ ভাবতে পারে।’

যুদ্ধ বন্ধ করে গাজার মানুষের দুর্ভোগ থামানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞে আমরা যথেষ্ট ভুগেছি। ধ্বংস করার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই, তারপরও আমাদের দুর্ভোগ চলছেই।’

নেতৃত্ব বদলালেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিয়ে সন্দেহ

উত্তর গাজার বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সী মানার ওওয়াইদা এখন গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। ইসরায়েলের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন তিনিও। নির্বাচনের ফল গাজার পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে ভাবছেন।

ওওয়াইদা বলেন, ‘তারা কী বলছে ও কী পরিকল্পনা করছে, তা জানার জন্য আমি নির্বাচন অনুসরণ করি। আমাদের চারপাশে কী ঘটছে এবং ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গাজার পরিস্থিতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা বুঝতে চাই।’

নেতানিয়াহুর পরিবর্তে গাদি আইজেনকটের দায়িত্ব নেওয়ার পক্ষে তিনি। তাঁর মতে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় বেশি উগ্র। তবে ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেই ফিলিস্তিনিদের জীবনে বড় পরিবর্তন আসবে বলে বিশ্বাস করেন না তিনি। তাঁর যুক্তি, কয়েক দশক ধরে দেশটির সরকারের নীতিতে ধারাবাহিকতা রয়েছে।

ওওয়াইদা বলেন, ‘ইসরায়েলের নীতি অপরাধ, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের। ১৯৪৮ সাল থেকে একই নীতি, একই হত্যা ও একই অবরোধ চলে আসছে।’

তারপরও নতুন সরকার অবরোধ ও হত্যাকাণ্ড কমাবে এবং ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরে থাকা এলাকাগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে বলে আশা করেন তিনি। এতে গাজায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসতে পারে বলে মনে করেন ওওয়াইদা।

তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কেউ এলে এবং আমাদের ওপর চলমান অবরোধ ও হত্যাকাণ্ড কমালে ইসরায়েলের নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইয়েলো লাইন থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হতে পারে এবং গাজায় ধীরে ধীরে জীবন ফিরে আসতে পারে। তবে আমরা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করছি, পাশাপাশি সামান্য আশাও রয়েছে।’

নির্বাচনের সময় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এড়াতে নেতানিয়াহু বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু করতে পারেন—এমন আশঙ্কাও রয়েছে ওওয়াইদার। ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর প্রত্যাশা, ফিলিস্তিনিরা যেন আরও সহিংসতার ভয় ছাড়াই বাঁচতে পারেন। ওওয়াইদা বলেন, ‘আমরা হত্যা ও যুদ্ধ থেকে দূরে থেকে স্বাধীনতা ও শান্তিতে বাঁচতে চাই।’

বাস্তুচ্যুতদের ঘরে ফেরার প্রত্যাশা

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৩ বছর বয়সী মুসা আলী এখন চার সন্তানকে নিয়ে গাজা সিটিতে বসবাস করছেন। তার মতে, ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করতে পারে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরের এলাকাগুলোতে ফিরতে পারবেন কি না।

আলী বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ইয়েলো লাইনের কারণে। আমরা আশা করি, বাস্তুচ্যুত মানুষকে তাঁদের এলাকায় ফিরতে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরোধীরা আরও ভালো ভূমিকা রাখবে।’

বিকল্প হিসেবে গাদি আইজেনকটের নাম উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি আরব দলগুলো নির্বাচনে ভালো ফল করবে এবং পরবর্তী সরকারে ভূমিকা রাখতে পারবে বলেও আশা করেন।

তবে নতুন কোনো নেতা এলেই গাজার মানুষের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন না আলী। ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাও করছেন তিনি। তার মতে, নেতানিয়াহু আবারও জয়ী হলে বাস্তুচ্যুতি ও ‘ইয়েলো লাইন’-সংলগ্ন এলাকাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘায়িত হতে পারে।

আলী বলেন, ‘গাজায় প্রতিদিন রক্ত ঝরছে, মানুষ নিহত হচ্ছে, চারদিকে বোমা হামলা চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, এই নীতির অবসান হবে এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী চলমান রক্তপাত বন্ধ করবেন।’