২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৮

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের ভোট আজ

ইসরালেয়ের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু   © টিডিসি ফটো

ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর প্রথমবারের মতো নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন ইসরায়েলের নাগরিকেরা। আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ২৬তম পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচনে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের রাজনীতিতে ডানপন্থী দলগুলোর প্রভাব নিয়ে নিজেদের মতামত জানাবেন ভোটাররা। নির্বাচনের ফল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং দেশটির পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। খবর বাসসের।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধের প্রায় তিন বছর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই নির্বাচন। গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব এখনো ইসরায়েলের রাজনীতি ও জনমনে রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে তাই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

একই সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। গাজায় সামরিক অভিযানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা এবং ডানপন্থী ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

জনমত জরিপে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর প্রধান মধ্যপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের মধ্যে প্রায় সমান জনপ্রিয়তার চিত্র উঠে এসেছে। ফলে এবারের নির্বাচন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলে প্রায় ৭৩ লাখ নাগরিকের ভোটাধিকার রয়েছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। জরিপ অনুযায়ী, এসব তরুণের অধিকাংশ নিজেদের মধ্য-ডানপন্থী বা ডানপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী বলে মনে করেন।

নির্বাচনের গুরুত্ব বিবেচনায় বিদেশ থেকে কয়েক দশ হাজার ইসরায়েলি দেশে ফিরেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগের দিন জেরুজালেমে ৫৮ বছর বয়সী আবাসন ব্যবসায়ী উরিয়েল ব্র্যান্ডলার বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, ইসরায়েল রাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দিন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের ভালো পরিবর্তন প্রয়োজন।’

ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বিরতি দিয়ে দিয়ে মোট ১৯ বছরেরও বেশি সময় সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি নিজের নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়ে অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককেও সামনে এনেছেন। নেতানিয়াহুর দাবি, ইসরায়েলের নাগরিকদের নিরাপদ রাখার সক্ষমতা তাঁরই রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তাঁর নেতৃত্বে ইসরায়েল একাধিক সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযানে বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়েছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী অবস্থান নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরানের ওপরও ব্যাপক হামলা চালিয়েছে দেশটি। এ সময় ইরান, হামাস, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার মুখেও পড়েছেন ইসরায়েলের নাগরিকেরা।

নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা কঠিন সময়ে তাঁর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ৮৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নারী জিপ্পোরাহ বেনেট জানিয়েছেন, তিনি নেতানিয়াহুকেই ভোট দেবেন। বেনেট বলেন, ‘মার্কিন সরকারের পূর্ণ সমর্থন তার রয়েছে। আর আমি বিশ্বাস করি, তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি পদক্ষেপ নিতে ভয় পান না।’

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিরোধীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় যে ব্যর্থতা ছিল, তার দায় তিনি স্বীকার করেননি। ওই হামলাকে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ক্ষমতায় গেলে হামলার আগে ও সময়কার নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করবেন। তবে নেতানিয়াহুর সরকার এখন পর্যন্ত এ ধরনের তদন্তের উদ্যোগ নিতে অনীহা দেখিয়েছে।

নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্য নিয়ে আইজেনকোটের নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একটি অনানুষ্ঠানিক জোট গড়ে উঠেছে। তাঁর দল ‘ইয়াশার’-এর নেতৃত্বাধীন এই জোটে ডানপন্থী থেকে মধ্য-বামপন্থী মতাদর্শের দল রয়েছে। তবে আইজেনকোট ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সহিংসতায় জড়িত ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।

ডানপন্থী দলগুলোর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ:
২০২২ সালের ডিসেম্বরে আবারও ক্ষমতায় ফেরার পর নেতানিয়াহু তাঁর সরকারে উগ্র ডানপন্থী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর থেকে ইসরায়েলের রাজনীতিতে এসব দলের প্রভাব বেড়েছে। সামরিক বাহিনীতে জনবলের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও অতি-গোঁড়া ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করছে বিরোধীরা। তাদের অভিযোগ, সরকার গঠনে অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এ বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট কেউই প্রকাশ্যে আরব ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের জোটে যাওয়ার ঘোষণা দেননি। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ আরব। নির্বাচনে আসনবণ্টনের পরিস্থিতি অনুযায়ী, এসব দলের সমর্থন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সরকার গঠনে সমীকরণ:
ইসরায়েলের পার্লামেন্টে মোট আসন ১২০টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। কোনো একক দলই এই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে মনে করা হচ্ছে না। ফলে নির্বাচনের পর সরকার গঠনে বিভিন্ন দলের মধ্যে জোট ও সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। চূড়ান্ত ফল প্রকাশে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এরপর সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতায় কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। সমঝোতা ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবারও নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এবারের ভোটে শুধু নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থনই যাচাই হবে না। একই সঙ্গে ৭ অক্টোবরের হামলার পর নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে জবাবদিহি, সামরিক নীতি এবং ডানপন্থী দলগুলোর প্রভাব নিয়েও ভোটারদের অবস্থান প্রতিফলিত হবে। নির্বাচনের ফল এবং পরবর্তী জোট গঠনের আলোচনা নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কোন পথে এগোবে।

সর্বশেষ নির্বাচন ১ নভেম্বর, ২০২২ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল দেশটির ২৫তম পার্লামেন্ট নির্বাচন, যার মাধ্যমে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পুনরায় জোট সরকার গঠন করে ক্ষমতায় আসেন।

সূত্র: বাসস