২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৭

ইউরোপের এক দেশে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’

জয়ের পথে স্টুডেন্ট লিস্ট   © সংগৃহীত

ইউরোপের দেশ সার্বিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচনে বড় জয়ের পথে রয়েছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিরোধী জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে জোটটি ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা আলেকসান্দার ভুচিসের রাজনৈতিক শিবির প্রায় ১০৫টি আসন পেতে পারে। নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন ভুচিস। তবে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশের আগেই তাঁর এই স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে দেশটিতে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। 

রবিবার (২৫ অক্টোবর) সার্বিয়ায় আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিক ফলাফলে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জোটের এগিয়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন স্থানে সমর্থকেরা উল্লাসে মেতে ওঠেন। বেলগ্রেডভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ফোনেট জানায়, ভুচিসের পরাজয় স্বীকারের ঘোষণার পর ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর কার্যালয়ে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। সমর্থকেরা নেচে-গেয়ে বিজয় উদ্‌যাপন করেন।

ভুচিস বলেন, ‘এটা স্পষ্ট, আমরা এ নির্বাচনে হেরে গেছি।’

প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে তিনি জানান, ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক শিবির পেতে পারে প্রায় ১০৫টি আসন। সার্বিয়ার পার্লামেন্টে মোট আসন ২৫০টি। ফলে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে রয়েছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন জোট।

‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর প্রার্থী রাদোমির সাইসিস জোটের নির্বাচনী সদর দপ্তরে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, প্রাথমিক ফলাফলে প্রায় সব কেন্দ্রেই শিক্ষার্থীদের বাছাই করা প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা জিতেছে। সার্বিয়ায় ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে, সে আশাও জিতেছে। আজ রাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হোক।’

শিক্ষার্থীদের এই নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে রয়েছে প্রায় দুই বছর ধরে চলা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন। ২০২৪ সালে সার্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর নোভি সাদের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। ওই ঘটনার পর দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারের বিরুদ্ধে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা রেলস্টেশনের ছাউনি ধসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবির পাশাপাশি সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এই আন্দোলন থেকেই শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নির্বাচনী শক্তি হিসেবে উঠে আসে। 

সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) নেতা আলেকসান্দার ভুচিস ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দল ও রাজনৈতিক মিত্ররা সার্বিয়ার ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন।

সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকতে পারেন। ফলে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ না থাকায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন ভুচিস। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের উত্থান তাঁর সেই পরিকল্পনার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণও আলোচনায় এসেছে। সার্বিয়ার নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ। মূল লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর দেশটিতে এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি। তবে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থার হিসাবে ভোটার উপস্থিতির চূড়ান্ত হার ভিন্ন হতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব বেলগ্রেডের গবেষক জেলেনা ভাসিলজেভিক শুক্রবার আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এসএনএসের একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে। তবে নির্বাচনে ভালো করতে হলে সাধারণত ভোট দেন না—এমন ভোটারদেরও কেন্দ্রে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

এদিকে নির্বাচনে অনিয়ম ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও উঠেছে। স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘সেন্টার ফর রিসার্চ, ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ (সিআরটিএ) জানিয়েছে, ৫০০টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করে তাদের পর্যবেক্ষকেরা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রে ভোটার বা নির্বাচনী কর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছেন। সংস্থাটি ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে।

আরেক নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ফ্রি ইলেকশনস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ জানিয়েছে, রোববার বিকেল ৫টা নাগাদ তারা সম্ভাব্য অনিয়মের প্রায় ২৬০টি অভিযোগ পেয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল ব্যালট পেপারের ছবি তোলা, দলবদ্ধভাবে ভোট দেওয়া এবং ভোটারদের পরিচয় যাচাইয়ে জটিলতা। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

ভুচিসের পরাজয় স্বীকারের পর বেলগ্রেডের রাজপথে নেমে আসেন হাজারো মানুষ। গাড়ির হর্ন, স্লোগান ও আতশবাজিতে মুখর হয়ে ওঠে রাজধানী। ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর সমর্থকেরা গাড়ি নিয়ে শহরের বিভিন্ন সড়কে ঘোরেন এবং নেচে-গেয়ে বিজয় উদ্‌যাপন করেন।

বেলগ্রেডের পার্লামেন্ট ভবন ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের মাঝামাঝি একটি ছোট পার্কে প্রায় ১৮ মাস ধরে এসএনএসের সমর্থকেরা তাঁবু টানিয়ে অবস্থান করছিলেন। নির্বাচনের পর সেখানে জড়ো হওয়া জনতা তাঁবুগুলো ভেঙে দেন। ঘটনাটি ভুচিসের রাজনৈতিক শিবিরের ওপর জনসমর্থন কমে যাওয়ার প্রতীকী চিত্র হিসেবে সামনে আসে।