২৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০:২৭

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে টানা ৩৪ দিনের মতো উত্তাল ফ্রান্স

বিক্ষোভে রাস্তায় নামেন ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা  © সংগৃহীত

শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে গেল সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখে প্রথমবারের মতো বিক্ষোভে রাস্তায় নামেন ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা। এরপর দিন যত গড়িয়েছে ততই তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। তাতে পুলিশের বাধা, জলকামানের তোপ আর গণ গ্রেপ্তার এড়িয়ে টানা ৩৪ দিনের মতো চলছে সেই বিক্ষোভ। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন অভিভাবকরাও, তাতে রাজপথেই নিজের ভাগ্য নির্ধারণের প্রহর গুনছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। চলমান এই আন্দোলনে প্রাণহানির এখনও পর্যন্ত ১, তবে হতাহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে কয়েকশ। পুলিশের হাতে আটক প্রায় ১৩০০।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের (২৪ অক্টোবর) বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। এর ফলে গত ১৭ অক্টোবর বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া লুটপাট ও ভাঙচুরের পুনরাবৃত্তি অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব হয়। 

বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সলিদেয়ারের সহ-নেত্রী মুরিয়েল গিলবার্ট বিএফএম টিভিকে বলেন, ‘আমরা ক্ষোভের সম্মিলন দেখতে পাচ্ছি।’ তার ভাষ্য, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, দমকলকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অসন্তোষ এক জায়গায় মিলিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষকে আগামী শনিবার রাস্তায় নামার আহ্বান জানাচ্ছি।’ শিক্ষক সংগঠন এসইউডি এডুকেশন জানিয়েছে, তারা ৩১ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশ নেবে। অন্যদিকে বড় শ্রমিক সংগঠন সিজিটি জানিয়েছে, তারা চলতি সপ্তাহে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

২০১৮ সালে জ্বালানি করের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরাও আগামী শনিবার বড় ধরনের সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন নগর ভবন ও জাতীয় সংসদের বাইরে অবস্থান কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।

আন্দোলনকর্মী আজেলমা সিগো সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশজুড়ে ক্ষোভ বাড়ছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়, সড়কের মোড়, আবাসিক এলাকা, খামার এবং কর্মক্ষেত্র—সব জায়গাতেই এই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে।’

ম্যাক্রোঁর সামনে সীমিত বিকল্প

২০১৯ সালে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সময় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জ্বালানির ব্যয় কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে সাত বছর পর দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় এবার বিক্ষোভকারীদের দাবি পূরণে তার সামনে সুযোগ সীমিত।

এ ছাড়া আগামী এপ্রিলে তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তার মধ্যপন্থী দলও বড় ধরনের আইন পাস করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে।

সংকট প্রশমনে সরকার শ্রমিক সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। তবে আন্দোলনের নেতারা বলছেন, এখন পর্যন্ত সরকারের প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো তাদের অসন্তোষ দূর করার জন্য যথেষ্ট নয়। মুরিয়েল গিলবার্ট বলেন, ‘এই সরকারের কাছ থেকে আমরা কোনো সাড়াই পাইনি।’

পুলিশের সংগঠনগুলোও জানিয়েছে, শনিবারের মতো বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন রাখার মতো পর্যাপ্ত জনবল তাদের নেই। শনিবার ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে প্যারিস ও মার্সেইসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের মধ্যেই পরিস্থিতি সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছিল।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে ১ হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। এদিন প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন, যেখানে আগের সপ্তাহে আহত পুলিশের সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্সের বাইরেও। গেল কয়েকদিনের ধারাবাহিকতায় শনিবারও বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। ইউরোপের আরেক দেশ আলবেনিয়ায় মে মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলতি মাসে সহিংসতায় রূপ নেয়। এদিকে ইতালির কয়েকটি শহরেও টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।