২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:২৭

ভিসা ছাড়াই ইউরোপ ভ্রমণের সুযোগ পেতে পারেন আরও ৫ দেশের নাগরিক

ইউরোপিও ইউনিয়ন   © টিডিসি ছবি

সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও কাতারের নাগরিকদের শেনজেন ভিসা ছাড়াই ইউরোপ ভ্রমণের সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পথে এগিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। গত ১৯ অক্টোবর এ পাঁচ দেশের সঙ্গে ভিসা ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে পাঁচটি পৃথক সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইইউ কাউন্সিল। তবে এখনই ভিসা ছাড়াই ইউরোপ ভ্রমণ করতে পারবেন না এসব দেশের নাগরিকেরা। এ সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে এবং ইইউর প্রয়োজনীয় আইনি অনুমোদন নিতে হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভিসা ছাড় নিয়ে আলোচনায় এ সিদ্ধান্তকে অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো দেশের নাগরিকদের জন্য শেনজেন ভিসার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ভিসা ছাড়ের উদ্যোগে রয়েছে যে পাঁচ দেশ

ইইউ কাউন্সিলের ১৯ অক্টোবরের সিদ্ধান্তে সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশগুলোর জন্য গৃহীত সিদ্ধান্তের নম্বর যথাক্রমে এসটি ১৪৬৩০/২৬, এসটি ১৪৬২১/২৬, এসটি ১৪৬২৬/২৬, এসটি ১৪৬২৭/২৬ এবং এসটি ১৪৬২৯/২৬।

প্রতিটি দেশের বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তে প্রায় একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ভিসা ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ইইউ কাউন্সিল ও সদস্য দেশগুলোর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ৫ অক্টোবর ইইউর সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে গঠিত কমিটি অব পারমানেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভস (কোরেপার) এসব সিদ্ধান্ত এবং প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে।

এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের ভিসা ছাড় দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করা।

ভিসা ছাড় পেতে পূরণ করতে হবে কয়েকটি শর্ত

ইইউ কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে পাঁচ দেশের নাগরিকেরা এখনই শেনজেন ভিসা ছাড়াই ইউরোপ ভ্রমণ করতে পারবেন। ভিসার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার আগে নির্ধারিত সব শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছে কাউন্সিল।

১৯ অক্টোবর গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোতে শর্তগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। তবে প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালানোর কথা বলা হয়েছে।

সাধারণত কোনো দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা ছাড়ের বিষয়টি মূল্যায়নের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্রমণ নথির নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয় এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা।

এ ছাড়া ভিসা ছাড় কার্যকর করতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যায়ে প্রয়োজনীয় আইনি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে সম্ভাব্য এ সুবিধা কবে থেকে কার্যকর হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

২০২২ সাল থেকেই ভিসা ছাড়ের প্রস্তাবে রয়েছে কুয়েত ও কাতার

উপসাগরীয় দেশগুলোর নাগরিকদের শেনজেন ভিসা ছাড় দেওয়ার আলোচনা নতুন নয়। ২০২২ সালের ২৭ এপ্রিল ইউরোপীয় কমিশন কুয়েত ও কাতারের নাগরিকদের স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভিসার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

ওই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল, ইইউর ভিসা ছাড় পাওয়া দেশের তালিকায় কুয়েত ও কাতারকে অন্তর্ভুক্ত করা। এর ফলে দেশ দুটির নাগরিকেরা যেকোনো ১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত ভিসা ছাড়াই শেনজেন অঞ্চলে ভ্রমণ করতে পারতেন।

তবে ২০২২ সালে শুরু হওয়া আইনি প্রক্রিয়া এখনো ভিসা ছাড়ের বাস্তব সিদ্ধান্তে গড়ায়নি।

ইইউ কাউন্সিলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কুয়েত ও কাতারের পাশাপাশি সৌদি আরব, বাহরাইন ও ওমানকেও বৃহত্তর ভিসা ছাড়ের উদ্যোগের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে উপসাগরীয় পাঁচ দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা ছাড়ের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

২০১৫ সাল থেকেই ভিসা ছাড়াই শেনজেন অঞ্চলে যেতে পারেন আমিরাতের নাগরিকেরা

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয়টি সদস্য দেশের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিকেরা আগে থেকেই শেনজেন অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের জন্য ভিসা ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন।

২০১৫ সালের ৬ মে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে এ বিষয়ে একটি চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, আমিরাতের নাগরিকেরা যেকোনো ১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত ভিসা ছাড়াই শেনজেন অঞ্চলে ভ্রমণ করতে পারেন।

বাকি পাঁচ দেশের সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত সফল হলে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয়টি সদস্য দেশের নাগরিকেরাই একই ধরনের ভিসা ছাড়ের সুবিধা পেতে পারেন।

তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ উদ্যোগের সঙ্গে উপসাগরীয় ছয় দেশের জন্য প্রস্তাবিত অভিন্ন পর্যটন ভিসাকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। অভিন্ন পর্যটন ভিসার লক্ষ্য হলো, বিদেশি পর্যটকদের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে যাতায়াত আরও সহজ করা।

আপাতত শেনজেন ভিসা নিতে হবে পাঁচ দেশের নাগরিকদের

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভিসা-সংক্রান্ত নিয়ম আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও কাতারের নাগরিকদের স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের জন্য শেনজেন ভিসা নিতে হবে। তবে ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ভিত্তিতে কেউ নির্দিষ্ট কোনো ছাড়ের আওতায় পড়লে তার ক্ষেত্রে ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে।

তাই আপাতত এসব দেশের ভ্রমণকারীদের প্রচলিত নিয়ম মেনেই ভিসার আবেদন করতে হবে।

ভবিষ্যতে ভিসা ছাড়ের সুবিধা অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট পাঁচ দেশের নাগরিকদের সাধারণভাবে ইউরোপীয় ভ্রমণ তথ্য ও অনুমোদন ব্যবস্থা বা ইটিআইএএসের (ETIAS) আওতায় ভ্রমণ অনুমোদন নিতে হতে পারে। অন্যান্য ভিসা ছাড় পাওয়া দেশের ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রেও এ ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে। তবে ইইউর নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে।

ইটিআইএএস কোনো ভিসা নয়। এটি একটি ইলেকট্রনিক ভ্রমণ অনুমোদন, যা যোগ্য ভ্রমণকারীদের যাত্রা শুরুর আগে নিতে হবে। ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভিসা ছাড় পাওয়া ভ্রমণকারীদের জন্য এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

ইটিআইএএসের সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ব্যবস্থাটি এখনো চালু হয়নি এবং এর আবেদন গ্রহণও শুরু হয়নি।

পরবর্তী পদক্ষেপ কী

সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও কাতারের নাগরিকেরা শেষ পর্যন্ত শেনজেন ভিসা ছাড়াই ইউরোপ ভ্রমণের সুযোগ পাবেন কি না, তা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, ইউরোপীয় কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে হবে। সবশেষে এ বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এসব প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাঁচ দেশের নাগরিকদের শেনজেন অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের জন্য প্রচলিত ভিসার নিয়ম মেনেই চলতে হবে।