২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৪৭

ককরোচদের আন্দোলনের মধ্যেই প্রকাশ্যে ভারতের নির্বাচন কমিশনের অন্তর্দ্বন্ধ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার ড. সুখবীর সিং সান্ধু ও ড. বিবেক যোশি  © সংগৃহীত

ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) নিয়ে দেশজুড়ে চলমান ককরোচদের আন্দোলনের মধ্যেই এবার প্রকাশ্যে এল ভারতের নির্বাচন কমিশনের মধ্যকার দ্বন্ধ। কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার ড. সুখবীর সিং সান্ধু ও ড. বিবেক যোশি এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব টি ভি সোমনাথনকে পৃথক চিঠি দিয়েছেন। কমিশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা। তথ্য অধিকার আইনে (আরটিআই) পাওয়া নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর এনডিটিভির 

চলতি বছরের ২৯ জুলাই পাঠানো চিঠি দুটিতে জ্যেষ্ঠ ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মনীশ গর্গের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। কমিশনারদের দাবি, কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আগাম আলোচনা না করেই তিনি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন পরিবর্তনের আদেশ জারি করেন।

সান্ধু তার চিঠিতে জানান, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার ভানু প্রকাশ ইয়েতুরুর ছুটির সময় ২৮ জুলাই গর্গকে প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গর্গ জ্যেষ্ঠ ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার, মহাপরিচালক ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজের বণ্টন পরিবর্তন করে আদেশ জারি করেন।

সান্ধুর অভিযোগ, কমিশন বা তাকে না জানিয়েই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। গর্গ নিজের জন্যও দায়িত্ব বরাদ্দ করেছেন এবং তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ বা সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজের বণ্টনেও পরিবর্তন এনেছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এর আগেও প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বে থাকাকালে গর্গ একই ধরনের আদেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সান্ধু আরও বলেন, কমিশনের আগাম আলোচনা ও অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত না নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বারবার মৌখিক ও লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তার অভিযোগ, গর্গের এই পদক্ষেপ ২০২৩ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও মেয়াদ) আইনের ১৮(১) ও ১৮(২) ধারা লঙ্ঘন করেছে। এ বিষয়ে ‘যথাযথ ব্যবস্থা’ নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

অন্যদিকে, পৃথক চিঠিতে একই ধরনের অভিযোগ করেন বিবেক যোশি। তার দাবি, কমিশনের সঙ্গে আলোচনা বা তাঁকে অবহিত না করেই গর্গ দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ জারি করেন। এ ছাড়া প্রশাসন বিভাগের কাছে সংশ্লিষ্ট নথি চেয়েও তিনি তা পাননি বলে অভিযোগ করেন।

যোশি তার চিঠিতে লেখেন, ‘এ ছাড়া, স্বাক্ষরকারী সংশ্লিষ্ট নথিটি প্রশাসন বিভাগের কাছে চাইলেও তা দেওয়া হয়নি।’

দুই কমিশনারই অভিযোগ করেন, কমিশনের পূর্বানুমোদন ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। তারাও ২০২৩ সালের আইনের বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে দুই কমিশনারের সরাসরি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের একটি নোটে চিঠি দুটির গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও বলা হয়, কমিশনের সামগ্রিকভাবে পাঠানো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছাড়া এ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হবে না।

নোটে উল্লেখ করা হয়, চিঠি দুটি কমিশনাররা ব্যক্তিগতভাবে পাঠিয়েছেন। তাই এগুলোকে পুরো কমিশনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এ অবস্থায় ব্যবস্থা নেওয়া অনুচিত হতে পারে এবং তা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

নোটে আরও সুপারিশ করা হয়, দুই কমিশনারের চিঠি গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করে এর অনুলিপি জনপ্রশাসন ও প্রশিক্ষণ বিভাগ (ডিওপিটি), প্রতিষ্ঠাপন কর্মকর্তা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ব্যক্তিগত সচিবের কাছে পাঠানো হোক। ভবিষ্যতে গর্গের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিষয়টি বিবেচনার জন্য নথিতে রাখারও সুপারিশ করা হয়। গর্গ একজন সর্বভারতীয় পরিষেবা কর্মকর্তা এবং নিয়োগসংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত।

৫ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব সোমনাথন চিঠি দুটির প্রাপ্তি স্বীকার করেন। সান্ধুকে পাঠানো জবাবে তিনি লেখেন, ‘কমিশনে জ্যেষ্ঠ ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মনীশ গর্গের কার্যক্রমসংক্রান্ত আপনার ২৯ জুলাই, ২০২৬ তারিখের ডি.ও. চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করছি।’ যোশিকেও একই ধরনের জবাব দেওয়া হয়। চিঠির অনুলিপি জনপ্রশাসন ও প্রশিক্ষণ বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

তবে আরটিআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া নথিতে চিঠি দুটির প্রাপ্তি স্বীকারের পর কোনো তদন্ত বা পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তার প্রমাণ নেই।
প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ইয়েতুরুর ছুটির সময় গর্গকে প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ২৮ জুলাইয়ের এক দাপ্তরিক আদেশে বলা হয়, ২৭ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে ইয়েতুরুর দায়িত্ব গর্গ পালন করবেন। একই দিনে কমিশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন পরিবর্তনের আরেকটি আদেশ জারি করা হয়।

অবসরপ্রাপ্ত কমোডর লোকেশ কে. বাত্রা ২৪ সেপ্টেম্বর আরটিআই আবেদনটি করেন। তিনি কমিশনারদের চিঠি, মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের নেওয়া পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট নথির মন্তব্য বা নোটের অনুলিপি চান। নির্ধারিত ফি পরিশোধের পর তাকে ১৪ পৃষ্ঠার নথি সরবরাহ করা হয়।

প্রকাশিত নথিতে নিশ্চিত হয়েছে, দুই কমিশনার দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে চিঠি দিয়েছিলেন এবং সেগুলোর প্রাপ্তি স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে অভিযোগের পর আর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।