বিশ্বে প্রতিবছর নষ্ট হয় ১০০ কোটি টন খাবার, অপচয়ের শীর্ষে দক্ষিণ এশিয়ার এক দেশ
কবি সুকান্ত ভট্টচার্য লিখেছিলেন ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরে অন্নের অভাবে থাকা মানুষের দুঃখ কষ্ট দ্বারা তাড়িত হয়েই এই পংক্তিটি লিখেছিলেন। তবে সময়ের পালাবদলে মানুষের ক্ষুধার কষ্ট লাঘব হয়েছে তবে বেড়েছে আরেক সমস্যা। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গ্রহণ করা প্রতি পাঁচ প্লেট খাবারের প্রায় এক প্লেটই শেষ পর্যন্ত ডাস্টবিনে যায়। সব মিলিয়ে প্রতি বছর এক বিলিয়ন টনের বেশি খাবার নষ্ট হয়। অথচ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত ছিল। অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ১৩ জনের একজন পর্যাপ্ত খাবার পায়নি। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল খাবার অপচয়ের শীর্ষে উঠে এসেছে এশিয়ার দেশ মালদ্বীপ। খবর আল জাজিরার
খাদ্যের অপচয় ও ক্ষুধার এই বৈপরীত্যের বিষয়টি সামনে রেখে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠার দিনটিকে স্মরণ করে প্রতিবছর দিবসটি পালন করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজ উদ্ভাবন, আগামীতে পুষ্টি’। এর লক্ষ্য হলো এমন খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে বেশি মানুষ খাবার পাবে এবং অপচয় কমবে।
জাতিসংঘের বার্ষিক ‘বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ক্ষুধার হার টানা তৃতীয় বছরের মতো কমেছে। তবে করোনাভাইরাস মহামারির আগের অবস্থার তুলনায় তা এখনো বেশি। ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। তবে ২০১৯ সালের তুলনায় এখনো প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত রয়েছে।
আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি
বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। ২০২৫ সালে মহাদেশটিতে আনুমানিক ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে। অর্থাৎ আফ্রিকার প্রতি পাঁচজনের একজন অপুষ্টির শিকার। বিশ্বে মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেকই এই মহাদেশের বাসিন্দা।
অন্যদিকে, এশিয়ায় ২৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে, যা মহাদেশটির মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এ সংখ্যা ৩ কোটি ২০ লাখ, যা ওই অঞ্চলের জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
২০২৬ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সেও দেশভিত্তিক ক্ষুধার চিত্রে একই ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। এ সূচকে অপুষ্টি, শিশুদের বয়সের তুলনায় কম উচ্চতা, উচ্চতার তুলনায় কম ওজন এবং শিশুমৃত্যুর হার বিবেচনা করে ১০০-এর মধ্যে স্কোর দেওয়া হয়। ৩৫ বা তার বেশি স্কোরকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১২২টি দেশের মধ্যে সোমালিয়ার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এরপর রয়েছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, চাদ ও মাদাগাস্কার। মোট আটটি দেশে ক্ষুধার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি আফ্রিকার দেশ।
সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনেও ক্ষুধার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তবে সংঘাত ও তথ্যের ঘাটতির কারণে এসব দেশের স্কোর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
প্রতি বছর নষ্ট হয় ১০০ কোটির বেশি টন খাবার
কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার প্লেটে পৌঁছানো পর্যন্ত খাদ্যের বিভিন্ন পর্যায়ে অপচয় হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাবারের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল কাটার পর থেকে দোকানে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় এসব খাবার নষ্ট হয়। ফল ও সবজিতে এ ধরনের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। দোকানে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হওয়া খাবারের আর্থিক মূল্য বছরে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দোকান, রেস্তোরাঁ ও পরিবারগুলো ভোক্তাদের জন্য বরাদ্দ খাবারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফেলে দিয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ১০৫ কোটি টন। ২০ টন করে পণ্য বহন করতে সক্ষম ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাকের সমান এই খাবারের পরিমাণ।
খাবার অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ঘটে পরিবারে। মোট অপচয়ের ৬০ শতাংশই পরিবারের কারণে হয়। রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাদ্যসেবা খাতের অবদান ২৮ শতাংশ এবং দোকানপাটের ১২ শতাংশ।
বাড়িতে খাবারের অপচয় কমানোর উপায়
বিশ্বে খাবারের অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যেহেতু পরিবারে ঘটে, তাই দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এ অপচয় কমানো সম্ভব। খাবারের অপচয় রোধে কাজ করা সংগঠন ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো কয়েকটি সহজ উপায়ের কথা জানিয়েছে।
কেনাকাটার আগে ঘরে কী কী খাবার আছে, তা দেখে নেওয়া এবং সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা করা উচিত। প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা তৈরি করে কেনাকাটা করলে অতিরিক্ত খাবার কেনার প্রবণতা কমে।
খাবারের মোড়কে থাকা তারিখের অর্থ বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। ‘ইউজ বাই’ তারিখ মূলত খাবার কত দিন পর্যন্ত নিরাপদে খাওয়া যাবে, তা নির্দেশ করে। অন্যদিকে, ‘বেস্ট বিফোর’ তারিখ খাবারের সর্বোত্তম গুণগত মানের সময়সীমা বোঝায়। এই তারিখ পার হওয়ার পরও অনেক খাবার খাওয়ার উপযোগী থাকতে পারে।
খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। ফ্রিজের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখা উচিত। ফল ও সবজি এমন জায়গায় রাখতে হবে, যেখানে সেগুলো বেশি দিন ভালো থাকে। উদাহরণস্বরূপ, কলা আশপাশের অন্যান্য ফল দ্রুত পাকিয়ে দিতে পারে।
খাবার নষ্ট হওয়ার আগেই ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা যায়। পাউরুটি, রান্না করা খাবার, মাংস এবং অনেক ধরনের ফল ও সবজি হিমায়িত করে রাখা সম্ভব।
প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার রান্না করলেও অপচয় কমে। বিশেষ করে ভাত ও পাস্তার মতো খাবার রান্নার সময় পরিমাণ মেপে নিলে বাড়তি খাবার ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন কম হয়।
ফ্রিজ ও আলমারিতে পুরোনো খাবার সামনে রাখতে হবে, যাতে নতুন খাবারের আগে সেগুলো ব্যবহার করা যায়। অবশিষ্ট খাবার দিয়ে নতুন পদ তৈরি করা যেতে পারে। সবজির খোসা ও ডাঁটাও স্যুপ কিংবা স্টক তৈরিতে কাজে লাগানো যায়।
যেসব খাবারের অংশ খাওয়া যায় না, যেমন ফলের খোসা ও ডিমের খোসা, সেগুলো কম্পোস্ট করা যেতে পারে। এতে এসব বর্জ্য ভাগাড়ে ফেলা কমবে। ভাগাড়ে খাবার পচে মিথেন গ্যাস তৈরি হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
কোন দেশে খাবারের অপচয় সবচেয়ে বেশি?
বিশ্বে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ১৩২ কেজি খাবার নষ্ট করেন। এর মধ্যে প্রায় ৭৯ কেজি খাবার নষ্ট হয় বাড়িতে। মোট পরিমাণটি ওজনে প্রায় দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সমান। তবে দেশভেদে খাবারের অপচয়ের পরিমাণে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইউএনইপির মতে, উষ্ণ দেশগুলোতে বাড়িতে খাবারের অপচয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বেশি তাজা খাবার গ্রহণ এবং খাবার সংরক্ষণের জন্য শীতলীকরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মালদ্বীপে মাথাপিছু খাবারের অপচয় সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে একজন মানুষ বছরে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার নষ্ট করেন, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এরপর রয়েছে সিরিয়া, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, সেশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশে মাথাপিছু বছরে ২১০ কেজির বেশি খাবার নষ্ট হয়। অন্যদিকে, স্পেনে মাথাপিছু খাবারের অপচয়ের পরিমাণ সবচেয়ে কম দেশগুলোর তুলনায়ও কম, বছরে প্রায় ৩৯ কেজি বা তার নিচে।
খাবারের অপচয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে খাদ্যের ক্ষতি ও অপচয়ের কারণে প্রতি বছর অর্থনীতির ক্ষতি হয় এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি।খাবার ফেলে দেওয়ার অর্থ শুধু খাদ্য নষ্ট করা নয়; এর সঙ্গে খাবার উৎপাদনে ব্যবহৃত অর্থ, জমি ও জ্বালানিও অপচয় হয়।
বিশ্বের প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর বা ৩৫০ কোটি একর জমিতে এমন খাবার উৎপাদন করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয় না। এটি বিশ্বের মোট কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ। আয়তনের দিক থেকে এ জমি কানাডার চেয়েও বড়। এছাড়া খাদ্যের ক্ষতি ও অপচয়ের কারণে বিশ্বে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের আনুমানিক ৮ থেকে ১০ শতাংশ ঘটে। এর মধ্যে ভাগাড়ে খাবার পচে উৎপন্ন মিথেন গ্যাসও রয়েছে।
বিশ্বে একদিকে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকছে। খাদ্যের অপচয় কমানো এবং উৎপাদিত খাবার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে তাই বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।