১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৫৪

ট্রাম্পের আপত্তির মুখে নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করবে না পেন্টাগন

মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য নিদাল হাসান   © সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য ও ফোর্ট হুডে গুলি করে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সপ্তাহে এ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানিয়ে দেন, নির্ধারিত সময়েই হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, কিন্তু তা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে না। খবর রয়টার্সের

চলতি সপ্তাহে সেনাবাহিনীর একটি অনুষ্ঠানে মঞ্চে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মন্তব্য করেছিলেন, জায়গাটি দেখতে অনেকটা টেলিভিশনের সেটের মতো। সাবেক ফক্স নিউজ উপস্থাপক হেগসেথ বলেন, এমন পরিবেশ তাকে স্বস্তি দেয়। এ সময় যুদ্ধবিরোধী এক বিক্ষোভকারী তাকে লক্ষ্য করে চিৎকার শুরু করেন। পরে আরও কয়েকজন বিক্ষোভকারীও প্রতিবাদ জানান।

টেলিভিশনে কাজ করার অভিজ্ঞতা পেন্টাগনে হেগসেথের দায়িত্ব পালনে সহায়ক হয়ে থাকলেও বৃহস্পতিবার তার একটি পরিকল্পনা থামিয়ে দেন ট্রাম্প। গত সপ্তাহে হেগসেথ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সেনাঘাঁটিতে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা ও ৩২ জনকে আহত করা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকরের সময় সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে জানতেন না ট্রাম্প। পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসার পর রিপাবলিকান দলের অনেক নেতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এর বিরোধিতা করেন। বৃহস্পতিবার রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারাও সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন।

ওয়াশিংটনে এ নিয়েও আলোচনা চলছে, আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প পেন্টাগনে নতুন নেতৃত্ব আনতে আগ্রহী হবেন কি না। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা কয়েক বছর দায়িত্ব পালনের পর পরিবর্তিত হন। তবে হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে মতপার্থক্য ট্রাম্প ও হেগসেথের সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

রিপাবলিকান দলের কৌশলবিদেরা মনে করছেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। দলটির কৌশলবিদ ডগলাস হেই বলেন, ট্রাম্প ও হেগসেথের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁরা একে অপরের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই ঘটনার আদৌ কোনো অর্থ আছে কি না, তা আমি জানি না।’

অভিজ্ঞ রিপাবলিকান কৌশলবিদ চার্লি ব্ল্যাকও মনে করেন, বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া আলোচনা দ্রুত থেমে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি অদ্ভুত ঘটনা, তবে আগামী সপ্তাহে কেউ আর এটি মনে রাখবে না।’ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পেন্টাগনও ট্রাম্প ও হেগসেথের মধ্যে মতবিরোধের বিষয়টি খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে নিজের সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগে হেগসেথের সঙ্গে কথা বলেছেন। পার্নেলের ভাষায়, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন এবং তাঁরা সম্পূর্ণভাবে একমত।’

হেগসেথকে প্রকাশ্যে প্রায়ই সমর্থন জানিয়ে থাকেন ট্রাম্প। সাবেক এই আর্মি ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে পেন্টাগনে ব্যাপক পরিবর্তন আনার সুযোগও দিয়েছেন তিনি। এ পরিবর্তনের অংশ হিসেবে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন হেগসেথ।

তবে সিনেটে অল্প ব্যবধানে নিয়োগের অনুমোদন পাওয়ার পরও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিজের যোগ্যতা নিয়ে রিপাবলিকান দলের অনেক আইনপ্রণেতার উদ্বেগ দূর করতে পারেননি হেগসেথ। ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়েও কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ও কংগ্রেসের সহকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

গত মাসে রিপাবলিকান দলের একজন আইনপ্রণেতা হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ কার্যকর করে হেগসেথ নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।

প্রতিনিধি থমাস ম্যাসির উত্থাপিত ওই প্রস্তাব পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

হেগসেথ ও কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্যের বিরোধ কখনো কখনো ব্যক্তিগত পর্যায়েও গড়িয়েছে। গত বছর ডেমোক্রেটিক সিনেটর মার্ক কেলির বিরুদ্ধে মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন হেগসেথ। সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা থাকা কেলিসহ কংগ্রেসের পাঁচ ডেমোক্র্যাট সদস্য তখন মার্কিন সেনাদের অবৈধ আদেশ পালন না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার কেলি এমন একটি বিল উত্থাপন করেন, যাতে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং বিপজ্জনক। ইরান ও আফগানিস্তানের তালেবানের মতো শাসনব্যবস্থায় আমরা এ ধরনের ঘটনা দেখতে পাই।’

যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিধান থাকলেও সরকারি উদ্যোগে কোনো মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করার ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা। এমনকি মার্কিন সেনাবাহিনী ১৯৪৫ সালের পর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেনি। ফলে হেগসেথের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা হতো।

২০০৯ সালে ফোর্ট হুডের বিশাল সেনাঘাঁটির একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা এবং ৩২ জনকে আহত করার দায়ে নিদাল হাসানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরিকল্পিত হত্যার দায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়। বর্তমানে তাঁর বয়স ৫৬ বছর। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর থেকে তিনি হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন।

হেগসেথের যুক্তি ছিল, মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা জনসমক্ষে আনলে এ ধরনের অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা যাবে। তিনি বলেছিলেন, ‘এ ধরনের কাজের গুরুতর পরিণতি রয়েছে, তা দেখানো হবে।’

ট্রাম্পও বৃহস্পতিবার এক পর্যায়ে হেগসেথের যুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা হলে বিশ্ব দেখতে পেত, সন্ত্রাসী ও হাসানের মতো ‘নীচ’ ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে আচরণ করে। তাঁর মতে, এমন দৃশ্য অন্যদের জন্য শক্তিশালী সতর্কবার্তা হতে পারত।

তবে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন ট্রাম্প। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘অনেক ভালো ও সদুদ্দেশ্যসম্পন্ন মানুষ সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে কিংবা অন্য কোনো দৃশ্যগত মাধ্যমে তাঁর মৃত্যু দেখতে চান না। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, তবে এ ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে না।’