যুক্তরাজ্যে ঝুঁকিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের বেশি হলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের হার বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি কমানো বা ভর্তির প্রস্তাব বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের তথ্য বিশ্লেষণ করে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে পড়াশোনার ভিসার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ আবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ২০২৩ সালে ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন প্রত্যাহারের হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নাইজেরীয় শিক্ষার্থীদের আবেদন প্রত্যাহারের হার ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির প্রস্তাব ব্যাপক হারে বাতিল করছে। নাইজেরিয়া ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা এ পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশঙ্কা, সরকারের কঠোর ভিসানীতির কারণে নির্ধারিত সীমার বেশি শিক্ষার্থীর ভিসা প্রত্যাখ্যান হলে তাদের বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতি বাতিল হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির প্রস্তাব পাওয়ার পর একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনার ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরে ভর্তির প্রস্তাব বাতিল করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ভিসার আবেদনও প্রত্যাহার হয়ে যায়। বিভিন্ন কারণে আবেদন প্রত্যাহার হতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে আবেদন প্রত্যাহারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভর্তির প্রস্তাব বাতিলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাষ্য, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভিসা প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সময়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর নিয়মকানুন আরও কঠোর করেছে সরকার। ফলে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তির প্রস্তাব প্রত্যাহার করছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির প্রস্তাব পাওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীর ভিসা প্রত্যাখ্যান হলে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। আগে এই সীমা ছিল ১০ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের সরকার সন্দেহ করছে, নির্দিষ্ট কিছু দেশের কিছু শিক্ষার্থী পড়াশোনার ভিসায় দেশটিতে প্রবেশ করে পরে আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন। এসব দেশের নাগরিকদের ভিসা আবেদন বেশি হারে প্রত্যাখ্যান করার পেছনে এই উদ্বেগ কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষা খাতের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ পুরোপুরি স্থগিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণকারী প্রতিষ্ঠান এনরোলির তথ্য বলছে, যুক্তরাজ্যের প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের বেশি। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ডের উপাচার্য স্যার ডেভিড বেল বলেন, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার সম্প্রতি অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আগেভাগেই পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে, যেসব দেশের শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সেসব দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিভার্সিটিজ ইউকে ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক জেমি অ্যারোসমিথ বলেন, অভিবাসনব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তাঁরা স্বীকার করেন। তবে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘অনেক ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যানের পেছনে ত্রুটিপূর্ণ, অসংগতিপূর্ণ এবং অত্যন্ত ব্যক্তিনির্ভর যুক্তি দেখা যাচ্ছে। ফলে নিয়ম মেনে চলার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম না করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যাপক হারে ভর্তির প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে হচ্ছে।’
কঠোর ভিসানীতি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাজ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদনও কমছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক সংকটের আশঙ্কা করছে। কারণ, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া টিউশন ফি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
যুক্তরাজ্যের ২০টি পেশাভিত্তিক ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন ইউনিভার্সিটি অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী ভেনেসা উইলসন বলেন, ‘এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পুনর্গঠন করতে হবে। আর পুনর্গঠনের অনিবার্য পরিণতি হবে কর্মী ছাঁটাই, কোর্স বন্ধ এবং ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেওয়া।’
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জানিয়েছে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের কিছু ঘটনায় অযৌক্তিক কারণ দেখানো হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী আগে অন্য দেশে পড়াশোনার কথা বিবেচনা করেছিলেন—এমন কারণেও তাঁর ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আবার একজন পিএইচডি গবেষণার আবেদনকারীকে তাঁর কোর্সের বিভিন্ন মডিউল বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। অথচ গবেষণাভিত্তিক পিএইচডি প্রোগ্রামে এ ধরনের নির্দিষ্ট মডিউল থাকে না।
ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার উপ-উপাচার্য অধ্যাপক স্টিভেন ম্যাকগুয়ের বলেন, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের শেষ দিকে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ও নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করার প্রস্তাব প্রত্যাহার শুরু করে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন কিছু প্রত্যাখ্যানের ঘটনা দেখেছি, যেগুলোর যুক্তি ছিল খুবই খামখেয়ালি ও তথ্যের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি ঘটনায় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী কর্মকর্তা বুঝতেই পারেননি যে ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়া নরউইচে অবস্থিত। এ কারণে ওই কর্মকর্তা আবেদনকারীর ভিসা প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ আবেদনকারী কোথায় পড়তে যাচ্ছেন, তা জানেন না বলে মনে করা হয়েছিল।’
অধ্যাপক ম্যাকগুয়ের সতর্ক করে বলেন, সরকারের এই নীতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চীন ও ভারতের শিক্ষার্থীদের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কারণ, এই দুই দেশের শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার তুলনামূলকভাবে কম। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আয় কমতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে কার্যক্রম ও আকার উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না বলেও তিনি মনে করেন।
ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের উপাচার্য এবং ইউনিভার্সিটিজ স্কটল্যান্ডের আহ্বায়ক অধ্যাপক জেমস মিলার বলেন, কিছু ভিসা প্রত্যাখ্যানের কারণ ‘অত্যন্ত ভিত্তিহীন’। ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার কেন বেড়েছে, সে বিষয়ে হোম অফিস শিক্ষার্থীদের আশ্রয়ের আবেদন করার সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা ছাড়া তেমন কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
তিনি বলেন, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের নিচে রাখতে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে।
অধ্যাপক মিলার আরও বলেন, চলতি বছর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ শতাংশের বেশি কমে যেতে পারে। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে এর ফলে কর্মী ছাঁটাই অনিবার্য হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, ‘এটি যুক্তরাজ্যের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে, সরকারের অন্যান্য নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ব্যক্তিপর্যায়ে এমন মানুষদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে, যাঁরা নিজেদের কর্মজীবন ও জীবনকে আরও এগিয়ে নিতে চান।’
যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বলেছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা দেশটির জন্য ইতিবাচক অবদান রাখেন। তবে এ অবদান রাখতে গিয়ে দায়িত্বশীলভাবে শিক্ষার্থী নিয়োগের বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না। একই সঙ্গে অভিবাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে হবে।
হোম অফিস আরও জানিয়েছে, শিক্ষার্থী নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও উন্নত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সহায়তা দেওয়া হবে।