১২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৫০

ককরোচ চোরাবালিতে আটকে গেছেন মোদি, ভারতের গণতন্ত্র কোনপথে?

ককরোচ আন্দোলন থেকে যুবক-যুবতিদের গণগ্রেফতার করছে দিল্লি পুলিশ  © সংগৃহীত

একটি কথা প্রচলিত আছে—মুরগির একটি করে পালক তুললে কেউ তা খেয়াল করে না। এভাবেই কিছু মানুষ নিজেদের বোঝান, ছোটখাটো অন্যায় কখনোই তাদের বিপদে ফেলবে না। কিন্তু এই কৌশলের সমস্যা হলো, একদিন সত্য সবার সামনে উন্মোচিত হয়, যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। চলতি অক্টোবরে দাঁড়িয়ে ভারতের গণতন্ত্রকে পালক ছেঁড়া মুরগির মতো দেখাচ্ছে—যার সব পালক উপড়ে ফেলা হয়েছে। আর রাস্তায় নেমে আসা বিক্ষোভকারীরা নিজেদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘তেলাপোকা’ বলে পরিচয় দিচ্ছেন।

গত ১২ বছর ধরে একের পর মুরগির এক পালক উপড়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটেছে। এর পরিণতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এখন কোণঠাসা অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ব্যারিকেডের আড়ালে পিছু হটেও তিনি এমন শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখোমুখি হচ্ছেন, যাদের কাছে গণতন্ত্রের ধীরগতির ক্ষয় এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে হারানোর মতো খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট নেই, ভয় পাওয়ারও তেমন কিছু নেই।

গত ১০ অক্টোবর ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে বড় ধরনের বিক্ষোভের মুখে পড়ে মোদি সরকার। এরপর সরকার এমন সব পদক্ষেপ নেয়, যা জরুরি অবস্থার সময়কার পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। নয়াদিল্লিগামী ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়, বিক্ষোভস্থলে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করা হয়।

বিক্ষোভের আগে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত পরিচিত ব্যক্তিদের আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন রত্না সিং, অভিজিৎ দীপকে ও ধ্রুব রাঠি। আটক হওয়া অন্য পরিচিত কর্মীদের মধ্যে ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীও।

সরকারের যাবতীয় আয়োজনের পরেও বিক্ষোভকারীরা নয়াদিল্লির রাস্তায় নেমে আসেন। তারা নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। দেশটির একের পর এক শহরেও একই দৃশ্য দেখা যায়। দিনভর পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা রাজধানীর এক জায়গা থেকে সরে অন্য জায়গায় জড়ো হন। নির্ধারিত স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তারা আন্দোলন থামাতে রাজি ছিলেন না।

দিনের শেষে রাজধানীজুড়ে অন্তত ২ হাজার ৫০০ বিক্ষোভকারী ও ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করে বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের অনেককে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এ ধরনের পদক্ষেপ মোদির নড়বড়ে অবস্থানকে আরও দুর্বল করেছে। সমালোচকেরা এখন প্রশ্ন তুলছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তাঁর আছে কি না। শুক্রবার বিরোধী দলগুলো রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিযোগ করে, সরকার ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে।

মোদির শাসনামলে সমস্যাগুলো জাহাজের গায়ে জমে থাকা শামুক-ঝিনুকের মতো একের পর এক জমেছে। প্রতিবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েই তিনি সেই গণতান্ত্রিক নীতিগুলো থেকে আরও দূরে সরে গেছেন, যেগুলোর ভিত্তিতে ভারতের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) ছিল সেই প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ঘটনা, যা গণতন্ত্রের শরীর থেকে আরেকটি পালক উপড়ে নিয়েছে। একে আমলাতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ ছাড়া অন্যভাবে বর্ণনা করার সুযোগ নেই। কারণ, এই প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটি ভারতীয়ের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

এই প্রক্রিয়া নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে সাহায্য করেছে—এ বিষয়টি নিয়ে এখন আর বিতর্কের সুযোগ নেই। এসআইআর তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার যে লজ্জায় পদত্যাগ করছেন না, সেটিই বিস্ময়কর। এর মধ্যে ২০০৬ সালের একটি দুর্নীতির মামলাও তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

নয়াদিল্লি ও ভারতের অন্যান্য স্থানে রাস্তায় বিক্ষোভকারীদের বিশৃঙ্খল, ক্ষুব্ধ ও আপসহীন উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তরুণ ও বৈচিত্র্যময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে মোদি ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে তরুণেরা, অন্যদিকে বয়স্ক ও রসবোধহীন একদল নেতা। 

মোদি সরকারের নেতারা মানুষকে হেয় করা এবং সমাজ থেকে বাদ দেওয়ার কৌশলের ওপর ভরসা করেছেন। তার মন্ত্রিসভায় এমন অনেক নেতা রয়েছেন, যারা নিজেদের গুরুত্ব সম্পর্কে অতিরিক্ত সচেতন। তারা ভুলভাবে ধরে নিয়েছিলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপরাধও মানুষ মেনে নেবে এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টি ও শত্রু বানিয়ে অনির্দিষ্টকাল দেশ শাসন করা সম্ভব।

আইন ভঙ্গকারীরা যখন আইন প্রণেতা হয়ে ওঠেন, তখন কী ঘটে, তা আমরা এখন দেখছি। অপরাধমূলক আচরণই এই রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে। মোদির শাসনামলে এসব নেতার মূল্যবোধই ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশকে সংজ্ঞায়িত করেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি ভারতের সংবিধানকে কার্যত ছিন্নভিন্ন হতে দিয়েছেন।

এখন সেই কর্মকাণ্ডের পরিণতি তার সামনে ফিরে এসেছে। যেসব ‘তেলাপোকা’কে তিনি নির্মূল করতে পারছেন না, তাদের দমনে মোদি নয়াদিল্লিকে দুর্গে পরিণত করেছেন এবং নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে তাঁর হাতে থাকা সব শক্তি প্রয়োগ করেছেন।

এটি তার দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি শান্তির আকাঙ্ক্ষার কথা বললেও ক্ষমতায় থাকার পুরো সময়ে বারবার সংঘাত সৃষ্টি করেছেন—প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যেমন, তেমনি শহরের ভেতরে প্রতিবেশীদের মধ্যেও।

১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ কেবল সূচনা। আগামী কয়েক সপ্তাহে মোদির সংকট আরও গভীর হতে পারে। সিজেপি জানিয়েছে, তাদের বিক্ষোভ চলবে। বিরোধী দলগুলোও সোমবার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে।

এই ‘তেলাপোকা’ বিক্ষোভকারীরা মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কতটা অদক্ষ—সে বিষয়ে অবশিষ্ট প্রশ্নগুলোরও যেন উত্তর দিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা বিশ্বের সামনে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা ভারতের গণতন্ত্রের ভেতরের ফাঁপা কাঠামো উন্মোচন করেছেন।

মোদির শাসনের অবসান যখন ঘনিয়ে আসছে—অন্তত আপাতত—তখন দেয়ালে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত স্পষ্ট। ইতিহাসের পাতায় মোদিকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতে পারে, যিনি ভারতের একটি পুরো প্রজন্মকে সরকার, সেনাবাহিনী, দিল্লি পুলিশ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে বাধ্য করেছেন।

নয়াদিল্লি বর্তমানে এক দমবন্ধ করা বর্তমান ও আশাব্যঞ্জক ভবিষ্যতের মধ্যবর্তী এক পরিবর্তনকাল অতিক্রম করছে। সময়ের এই কঠিন অধ্যায়, যতই দুর্বিষহ হোক না কেন, একদিন শেষ হবে।

সেই সময়ের ধুলো থিতিয়ে গেলে নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠীর প্রভাব ও ডানপন্থী মতাদর্শের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কী হবে—তার উত্তর দেবেন আজ রাস্তায় থাকা মানুষরাই। ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনকারীদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে এই উপলব্ধি স্পষ্ট। কারণ, এই আন্দোলনের মূল কথা হলো—ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া।

আল জাজিরা থেকে বাংলায় অনূদিত