নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতলেন নাভিনেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন নাভিনেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির প্রধান জর্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস এ ঘোষণা দিয়েছেন।
পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে ফ্রিডনেস বলেন, নাভি পিল্লাই ‘আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি ও প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছেন’। অসাধারণ সাহসিকতার সঙ্গে তিনি ‘আরও সমন্বিত বৈশ্বিক আইনি ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রশংসা করে নোবেল কমিটির প্রধান বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় গভীর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। ফ্রিডনেসের ভাষায়, পিল্লাই ‘দৃঢ় নৈতিক আদর্শের অধিকারী’।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার সময় ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। সমাজে গভীর বৈষম্য, পৃথকীকরণ ও বঞ্চনার পরিবেশে বেড়ে ওঠা পিল্লাই পরবর্তী সময়ে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। আইনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তিনি বর্ণবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নেলসন ম্যান্ডেলা ও অন্য আন্দোলনকারীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। পরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার কর্মজীবনের মূল লক্ষ্য ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট, রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন। সম্প্রতি তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় বিচারকের দায়িত্বে রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আদালতে দায়িত্ব পালনের সময় পিল্লাই দেখিয়েছেন, যুদ্ধ ও সহিংসতা প্রতিরোধে আইনি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতেও তিনি কাজ করেছেন। তার স্বাধীনচেতা মনোভাব, আইনি দক্ষতা ও নীতিতে অবিচল থাকার কারণে তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রদ্ধেয় আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
রুয়ান্ডার গণহত্যাসংক্রান্ত মামলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে পিল্লাইয়ের। রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন সিদ্ধান্ত দেয় যে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি গণহত্যার অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, তখন তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একই মামলায় আরেকটি ঐতিহাসিক আইনি অগ্রগতিতেও অবদান রাখেন তিনি। প্রথমবারের মতো কোনো আসামির বিরুদ্ধে শুধু প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
নাভি পিল্লাই বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছেন। কর্মজীবনে তিনি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের আইনের শাসন মেনে চলার বাধ্যবাধকতার ওপর জোর দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইনের প্রাসঙ্গিক নীতি ও মানদণ্ড নির্ধারণেও অবদান রেখেছেন।
নোবেল কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা ও সংঘাত নিরসনে পিল্লাইয়ের ভূমিকা শান্তি পুরস্কারের মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১২৫ বছর আগে প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সময়ও নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে সংঘাত নিরসনের গুরুত্ব তুলে ধরেছিল। শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসজুড়েই এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। বিশেষ করে জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পর এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটে। তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি তৈরি হয়—দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনি নীতির ভিত্তিতে এগোতে হবে; শক্তিশালী পক্ষের ইচ্ছা কিংবা ক্ষমতার ভঙ্গুর ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
যুদ্ধ-পরবর্তী কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের জন্য আরও কিছু ব্যবস্থা চালু করা হয়। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত হয়।
তবে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশগুলো প্রায়ই নিজেদের দায় এড়িয়ে গেছে। বাস্তবে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা মামলাগুলোর ফলাফলও অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করেছে কে অপরাধী আর কে ভুক্তভোগী, তার ওপর।
তারপরও দেখা গেছে, আগের তুলনায় এখন আরও বেশি সংঘাত কূটনীতি, চুক্তি ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। হুমকি, সহিংসতা ও যুদ্ধের পরিবর্তে এসব পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। বিশ্বনেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—অনেকেই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে আন্তর্জাতিক আইন আরও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার ভিত্তি।
বর্তমানে বিশ্ব দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ ও সংঘাতের মতো অস্তিত্বসংকটের মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক আইন আর শুধু সহায়ক কোনো বিষয় নয়; এটি এখন অপরিহার্য।
তবু আন্তর্জাতিক আইনের ব্যবস্থা তীব্র চাপের মুখে রয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলোও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। আইনি কাঠামো এবং আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি বৈশ্বিক শ্রদ্ধার পরিবর্তে ক্ষমতানির্ভর রাজনীতির দিকে ঝোঁক বাড়ছে। যখন ন্যায়বিচারের চেয়ে শক্তি বড় হয়ে ওঠে, তখন স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিতে চায়, আইনের শাসন—জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ে—শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং অহিংস উপায়ে সংঘাত নিরসনের জন্য গড়ে তোলা ব্যবস্থার ভিত্তি। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যায়বিচার অপরিহার্য।
ইতিহাস দেখিয়েছে, আইনের শাসন ছাড়া পরিচালিত বিশ্ব অন্যায্য, অবিবেচনাপ্রসূত ও অমানবিক হয়ে ওঠে। বিচারকেরা শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যকার সূক্ষ্ম সীমারেখা রক্ষা করেন। তাই তারা প্রশংসা ও স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।
কিন্তু বর্তমানে সেই বিচারকেরাই নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছেন এবং তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সাহস, দূরদৃষ্টি ও দৃঢ় সংকল্পসম্পন্ন মানুষ। নাভি পিল্লাই বিচারকের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে এসব গুণের পরিচয় দিয়েছেন।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের ভিত্তি সরাসরি আলফ্রেড নোবেলের উইল। নাভি পিল্লাই বিভিন্ন জাতির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি জোরদার করেছেন। শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি আধুনিক যুগের শান্তি সম্মেলনগুলোকে কার্যকর ভিত্তি, দিকনির্দেশনা ও প্রেরণা দিয়েছেন।
নাভি পিল্লাই আমাদের সময়ের আন্তর্জাতিক আইনি নীতির অন্যতম প্রধান রক্ষক। তার দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবন বিশ্বব্যাপী আইনের শাসনকে সমর্থন, শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি তার অঙ্গীকার আরও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে আগ্রহী সবার জন্য আশা ও অনুপ্রেরণার উৎস।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে এ পর্যন্ত ১০৬ বার পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এতে ১১২ জন ব্যক্তি ও ৩১টি প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছে। বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের চারজন প্রেসিডেন্ট—থিওডোর রুজভেল্ট, উড্রো উইলসন, জিমি কার্টার ও বারাক ওবামা।
২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়েন পাকিস্তানের শিক্ষা অধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই। তিনিই এ পুরস্কারের সবচেয়ে কম বয়সী বিজয়ী।
১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের রাজনীতিবিদ লে ডাক থো নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতায় যৌথভাবে ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিতে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হওয়ার কারণ দেখিয়ে তিনি পুরস্কারটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের উল্লেখযোগ্য বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং মানবসেবী মাদার তেরেসা।