০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪৪

দুর্বল ব্যক্তির কাঁধে নগ্ন স্থূল ট্রাম্প, হাতে দাঁড়িপাল্লা, কী বার্তা দিলেন শিল্পী?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নগ্ন মূর্তি   © সংগৃহীত

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভেতরে ব্যস্ত চলাচলের একটি পথে স্থাপন করা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাড়ে ৮ ফুট উঁচু একটি নগ্ন সোনালি ভাস্কর্য। মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রস্থলে ভাস্কর্যটি উন্মোচন করা হয়। পরিবেশ ও নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি ট্রাম্পের হুমকি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতীকী বার্তা দিতেই এই শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন এর নির্মাতা ডেনিশ শিল্পী জেন্স গালশিওট।

২৩ ক্যারেট সোনার পাতের পাতলা আবরণে মোড়ানো তামা দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যটির নাম ‘দ্য অরেঞ্জ প্লেগ’ বা ‘কমলা রঙের মহামারি’। এটিকে ‘কিং অব ইনজাস্টিস’ বা ‘অন্যায়ের রাজা’ নামেও অভিহিত করা হচ্ছে।

ভাস্কর্যটিতে দেখা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক দুর্বল ও ছোটখাটো গড়নের মানুষের কাঁধে চড়ে আছেন। তার উরু ও ঝুলে পড়া পেট ওই ব্যক্তির মাথাকে শক্তভাবে জড়িয়ে আছে। ট্রাম্পের হাতে রয়েছে একটি লম্বা গলফ ক্লাব ও ন্যায়বিচারের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা।

মূর্তিটির বেদিতে লেখা রয়েছে, ‘আমি এক ব্যক্তির পিঠে চড়ে বসে আছি। আমার ভারে সে তলিয়ে যাচ্ছে। তাকে সাহায্য করার জন্য আমি সবকিছুই করব—শুধু তার পিঠ থেকে নামা ছাড়া।’

মূর্তিটির নির্মাতা জেন্স গালশিওট ফোনে বলেন, ‘ট্রাম্প সোনা পছন্দ করেন। আমার মনে হয়, একদিক থেকে দেখলে তিনি হয়তো এই ভাস্কর্যটি পছন্দই করবেন।’

গালশিওটের মতে, পরিবেশ এবং নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি তিনি যেভাবে দেখেন, এই শিল্পকর্ম তারই প্রতীক। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প আমার বিশ্বাস ও আদর্শের পরিপন্থী সব কিছুই ধ্বংস করছেন।’

তবে ভাস্কর্যটি সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো নিন্দা বা ভর্ৎসনা নয়। প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা ডেনিশ রাজনীতিবিদ পার ক্লাউসেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা পার্লামেন্ট চত্বরে প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পারেন। তবে প্রতিটি প্রদর্শনীর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

পার্লামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অনুষ্ঠান বা প্রদর্শনী ‘আপত্তিকর, উসকানিমূলক বা ইউনিয়নের ভিত্তিস্বরূপ মূল্যবোধের পরিপন্থী’ হলে কিংবা ‘পার্লামেন্টের মর্যাদাহানি ঘটায়’ এমন হলে তা নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।

প্রদর্শনীর অনুমোদনের অর্থ এই নয় যে এতে উপস্থাপিত বিষয়বস্তুকে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করছে। তবে গালশিওট, যিনি আশঙ্কা করেছিলেন তার আবেদন বাতিল হতে পারে, এই অনুমতিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের এক ধরনের পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় অনেক আমেরিকানই বলেন, “ঠিক আছে, ইনিই আমাদের প্রেসিডেন্ট, তবে একদিক দিয়ে তিনি হাস্যকরও বটে।” আর আমার ধারণা, অধিকাংশ ইউরোপীয়ও তাঁকে এভাবেই দেখেন।’

গালশিওট তার প্ররোচনামূলক রাজনৈতিক শিল্পকর্মের জন্য পরিচিত। তার উল্লেখযোগ্য কাজ ‘পিলার অব শেম’ বা ‘লজ্জার স্তম্ভ’। ১৯৮৯ সালের তিয়ানানমেন স্কয়ার হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি ২০২১ সালে হংকংয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।

ট্রাম্পকে নগ্নভাবে চিত্রিত করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে গালশিওট বলেন, হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘দ্য এম্পেরর’স নিউ ক্লোদস’ বা ‘সম্রাটের নতুন পোশাক’ গল্প থেকে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ওই গল্পে এক অহংকারী সম্রাট নগ্ন অবস্থায় শহরে শোভাযাত্রা করেছিলেন। গালশিওট বলেন, ‘একনায়করা পছন্দ করেন না যে কেউ তাঁদের নিয়ে হাসাহাসি করুক।’

অস্থায়ী এই প্রদর্শনীটি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চালু থাকার কথা রয়েছে। এর সঙ্গে মূল ভাস্কর্যটির ১ হাজারের বেশি ত্রিমাত্রিক মুদ্রিত ক্ষুদ্র সংস্করণও রয়েছে। এগুলো পথচারীদের মধ্যে ‘প্রতিবাদের প্রতীক’ হিসেবে বিতরণ করা হচ্ছে।

প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা পার ক্লাউসেন ডেনমার্কের সমাজতান্ত্রিক দল ‘রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স’-এর সদস্য। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হওয়া ক্লাউসেন ‘দ্য লেফট’ নামের একটি বামপন্থী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এই গোষ্ঠীটি মোট আসনের প্রায় ৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

স্ট্রাসবুর্গ থেকে ফোনে ক্লাউসেন বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিশ্বজুড়ে ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে আমাদের আলোচনা করা প্রয়োজন। ট্রাম্পের কার্যকলাপ ইউরোপের মানুষের জন্য অত্যন্ত বড় একটি সমস্যা। আমি ইউরোপে এমন একটি আলোচনার সূত্রপাত করতে চাই যে, কীভাবে আমরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি এবং কীভাবে এমন রাজনীতি গড়ে তুলতে পারি যা তাঁর ওপর নির্ভরশীল নয়।’

ক্লাউসেন জানান, ‘চরম ডানপন্থী কিছু মানুষ’ ছাড়া ভাস্কর্যটির প্রতি মানুষের সাড়া ইতিবাচক ছিল। তিনি বলেন, ‘পার্লামেন্টে এমন সব বিষয় তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যার সঙ্গে হয়তো সবাই একমত নন।’

গালশিওট এর আগেও কয়েকবার জনসমক্ষে ‘দ্য অরেঞ্জ প্লেগ’ প্রদর্শন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন এবং গত নভেম্বরে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩০। আগামী মাসে তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠেয় কপ-৩১ সম্মেলনেও এটি প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই শিল্পকর্ম নিয়ে ট্রাম্প এখনো কোনো মন্তব্য করেননি।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেস সার্ভিসের এক মুখপাত্র ইমেইলে জানিয়েছেন, প্রদর্শনীটি পার্লামেন্টের ‘কোয়েস্টরদের’ অনুমোদন পেয়েছে। কোয়েস্টররা বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে গঠিত এমইপিদের একটি দল, যারা পার্লামেন্টের প্রশাসনিক বিষয়গুলোর দায়িত্বে থাকেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রতিটি পার্লামেন্টীয় মেয়াদে নির্ধারিত স্থানগুলোতে দুটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা প্রদর্শনীর আয়োজন বা পৃষ্ঠপোষকতা করার অধিকার প্রত্যেক এমইপির রয়েছে।’ এতে আরও বলা হয়, কোয়েস্টররা ‘বিদ্যমান নিয়মকানুন যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করেন।’

২০২৪ সালে ‘নিষিদ্ধ শিল্পকর্ম’ প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভবনের সামনে গালশিওট তার ‘পিলার অব শেম’-এর একটি প্রতিরূপ প্রদর্শন করেছিলেন। ডেনমার্কের আরেক এমইপি কিরা মেরি পিটার-হানসেনের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত ওই প্রদর্শনীটি হংকং ও মূল ভূখণ্ড চীনকে লক্ষ্য করে করা হয়েছিল। এসব অঞ্চলে ১৯৮৯ সালের তিয়ানানমেন স্কয়ার হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ কঠোরভাবে সেন্সর বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিজের সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পকর্ম এবং ট্রাম্পকে নিয়ে করা সাম্প্রতিক সমালোচনামূলক কাজের মধ্যে যোগসূত্র তুলে ধরে গালশিওট বলেন, ‘বিষয়টি ক্ষমতাধর ও ক্ষমতাহীনদের নিয়ে; আর এক অর্থে, “পিলার অব শেম”-ও ঠিক সেই বিষয়কেই তুলে ধরে।’