০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৪

‘সমকামী সাজিয়ে’ বাংলাদেশিদের ভুয়া আশ্রয় আবেদন, যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তার ৩

গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি   © সংগৃহীত

‘সমকামী সাজিয়ে’ বাংলাদেশিদের ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে একটি সন্দেহভাজন চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় অন্তত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। খবর বিবিসির।

লন্ডনের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকালে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অধীন অভিবাসন কর্মকর্তারা লন্ডনের কয়েকটি ঠিকানায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করেন। এ সময় মুঠোফোন, গয়না ও হাজার হাজার পাউন্ড অর্থ জব্দ করা হয়। অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানের সন্দেহে একই দিন আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, চক্রটি যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের সমকামী হিসেবে উপস্থাপন করে ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে দিত। এসব নথির মধ্যে সাজানো ছবি ও জাল কাগজপত্র রয়েছে। এর বিনিময়ে প্রত্যেক আশ্রয়প্রার্থীর কাছ থেকে ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়া হতো। ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি কয়েক ডজন বাংলাদেশি পুরুষের আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে। এসব আবেদনে দাবি করা হয়, আবেদনকারীরা সমকামী এবং দেশে ফিরে গেলে তাঁদের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অপরাধ তদন্ত বিভাগের আঞ্চলিক প্রধান ক্রিস ফস্টার বলেন, মঙ্গলবারের গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলভিত্তিক বাংলাদেশিদের এলজিবিটি সংগঠন ‘আপনজন’-এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি ভুয়া আশ্রয় আবেদনকে কেন্দ্র করে হয়েছে।

ক্রিস ফস্টার আরও বলেন, আশ্রয় আবেদন যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কয়েকটি সন্দেহজনক আবেদনে একই ধরনের তথ্য-উপাত্ত দেখতে পান। এতে সংগঠনটি নিয়ে তাঁদের সন্দেহ তৈরি হয়। এরপর অভিবাসন কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্তের পরই মঙ্গলবার অভিযান চালানো হয়।

‘আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা আশ্রয়প্রার্থীদের ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে দেন। এ জন্য একেকজনের কাছ থেকে ন্যূনতম ১ হাজার পাউন্ড ও সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫০০ পাউন্ড করে নেওয়া হয়,’ বলেন ক্রিস ফস্টার।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এই কর্মকর্তা বলেন, এসব নথিপত্রের মধ্যে ‘আপনজন’-এর পক্ষ থেকে দেওয়া সমর্থনপত্র থাকতে পারে। থাকতে পারে সাজানো ছবি। এসব ছবিতে আশ্রয়প্রার্থীদের সমকামী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকে। আবার এমন চিঠিও থাকতে পারে, যেখানে কেউ দাবি করেন, তিনি আবেদনকারীর সঙ্গে সমলিঙ্গের সম্পর্কে রয়েছেন।

এই অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত শতাধিক আশ্রয় আবেদন এখন পর্যালোচনা করছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর। এ বিষয়ে ক্রিস ফস্টার বলেন, এরই মধ্যে বেশ কিছু ভুয়া আশ্রয় আবেদন নিঃসন্দেহে অনুমোদন পেয়েছে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, অনেক বাংলাদেশি পুরুষ প্রথমে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাঁরা নিজেদের ‘সমকামী’ দাবি করে আবারও আবেদন করেন। এসব আবেদনে বলা হয়, যৌন পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশে ফিরে গেলে তাঁদের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে। আবেদন করার সময় তাঁদের পক্ষে ‘আপনজন’ নামের সংগঠনটি সুপারিশ করে থাকে।

বিষয়টি নিয়ে চলতি বছর বিস্তারিত অনুসন্ধান করেছে বিবিসি। গত এপ্রিলে প্রকাশিত ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাওয়ার জন্য কিছু অভিবাসীকে সমকামী সেজে আবেদন করতে আইনজীবী ও পরামর্শকেরা সহায়তা করছেন।

ওই প্রতিবেদনে তানিসা খান নামের এক আইনি পরামর্শকের মন্তব্য গোপনে রেকর্ড করেন বিবিসির প্রতিবেদক। তানিসা বলেন, তিনি আশ্রয় আবেদনের জন্য একটি ‘পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজের’ ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। এর আওতায় সমকামীদের ক্লাবে তোলা ছবি এবং আবেদনের পক্ষে অন্যান্য প্রমাণ থাকবে।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, ‘যাঁরা নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভান করেন, তাঁরা নিন্দারও অযোগ্য। তাঁরা সুরক্ষা পাওয়ার প্রকৃত দাবিদারদের নিয়ে উপহাস করছেন।’

তিনি বলেন, ‘এমন লজ্জাজনক প্রতারণা করে যাঁরা লাভবান হয়েছেন বা হচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। তাঁদের অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ জব্দ করা হবে। এ দেশে তাঁদের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

যাঁরা আশ্রয়ের আবেদনে প্রতারণা করেছেন, তাঁদের আবেদন বাতিল করা হবে বলেও জানান শাবানা মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘তাঁদের এই দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে।’

যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, আশ্রয় নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।