০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৫৬

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন, নেপথ্যে যে উদ্ভাবন 

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সিস হালজেন  © সংগৃহীত

দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে মহাজাগতিক উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তের পথ উন্মুক্ত করা এবং আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য চলতি বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সিস হালজেন। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এ পুরস্কার ঘোষণা করে।

একাডেমি জানিয়েছে, ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে নির্ণায়ক অবদান এবং জ্যোতিঃপদার্থবৈজ্ঞানিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য’ ফ্রান্সিস হালজেনকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সিস হালজেনের ধারণা ছিল, দক্ষিণ মেরুর বরফকে ব্যবহার করে নিউট্রিনো নামের অতিক্ষুদ্র কণার গতিবিধি শনাক্ত করা সম্ভব। তার বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি। প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে অসংখ্য আলোকসংবেদী সেন্সর। এর মাধ্যমে দূরবর্তী মহাবিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী প্রক্রিয়া থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করা যায়।

নিউট্রিনো মহাবিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু সাধারণভাবে এগুলোর উপস্থিতি বোঝা যায় না। নিউট্রিনো পৃথিবী ও মানুষের শরীর ভেদ করে চলে যায়। খুবই বিরল ক্ষেত্রে কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। তখন তৈরি হওয়া সংকেত শনাক্ত করার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এসব কণার অস্তিত্ব জানতে পারেন।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই জানেন, মহাবিশ্বে এমন কিছু প্রাকৃতিক কণা ত্বরক রয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর গবেষণাগারে তৈরি করা সম্ভব শক্তির তুলনায় লাখ গুণ বেশি শক্তির কণা ছুড়ে দিতে পারে। তবে এসব উৎসের অনেক কিছুই এখনো রহস্যময়—সেগুলো কী, কোথায় অবস্থিত এবং সেখানে মূলত কী ধরনের প্রক্রিয়া চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো অন্যান্য কণার মতো একই পরিবেশে তৈরি হয়। তবে অন্য কণার তুলনায় নিউট্রিনোর বিশেষত্ব হলো, এগুলো মহাবিশ্বের উৎস থেকে পৃথিবীতে পৌঁছানোর সময় দিক পরিবর্তন করে না এবং শক্তিও হারায় না। ফলে অন্য কোনো উপায়ে পাওয়া সম্ভব নয়—এমন তথ্য নিউট্রিনোর মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে।

১৯৮৮ সালে দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো শনাক্ত করার নিজের ধারণা প্রথম উপস্থাপন করেন হালজেন। কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে একটি আলোর ঝলক তৈরি হয়। দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ হিমবাহের বরফে স্থাপন করা সেন্সরের মাধ্যমে সেই আলো শনাক্ত করা সম্ভব।

নিউট্রিনো শনাক্তের জন্য দক্ষিণ মেরুর বরফকে উপযোগী করে তুলেছে আরও কিছু বৈশিষ্ট্য। সেখানে বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক বা অন্যান্য হস্তক্ষেপ তুলনামূলকভাবে কম এবং অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিকভাবে স্থিতিশীল। ফলে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক কম্পনেরও ঝুঁকি নেই। হালজেনের ধারণাটি দ্রুত অন্য গবেষকদের সমর্থন পায়। কয়েক বছরের মধ্যেই বরফের মধ্যে সেন্সর স্থাপন করে প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হয়।

মহাজাগতিক উচ্চশক্তির নিউট্রিনো অত্যন্ত বিরল হওয়ায় পর্যাপ্ত সংখ্যক সংঘর্ষ শনাক্ত করতে বিশাল পরিমাণ বরফের প্রয়োজন হয়। এ কারণে প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে আইসকিউব অবজারভেটরি স্থাপন করা হয়। ২০১১ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়।

এরপর গবেষকেরা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করতে শুরু করেন। কয়েক বছর পর তারা এমন নিউট্রিনো আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করেন, যেগুলোর উৎস সৌরজগতের অনেক বাইরে। এর মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বের নিউট্রিনোর উৎস অনুসন্ধানের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

আইসকিউবের মাধ্যমে নিয়মিত সংগৃহীত নিউট্রিনোর তথ্য গবেষকদের উচ্চশক্তির নিউট্রিনো তৈরির মতো মহাবিশ্বের ভয়াবহ ও শক্তিশালী পরিবেশ সম্পর্কে নতুন ধারণা দেবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে আগে অজানা মহাজাগতিক কোনো ঘটনারও সন্ধান মিলতে পারে।