শিক্ষায় অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স, বন্ধ ৪ শতাধিক স্কুল
শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি বিনিয়োগ কমানো, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করছেন স্কুলশিক্ষার্থীরা। শুক্রবার (২ অক্টোবর) দেশটির ৪ শতাধিক উচ্চবিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর আন্দোলনে অংশ নেওয়া শত শত তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। খবর গার্ডিয়ানের
রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে স্কুলের প্রবেশপথে ব্যারিকেড তৈরি করে ক্লাস বন্ধ করে দেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিচ্ছে না। আগামী সপ্তাহেও বিক্ষোভ ও স্কুল অবরোধ অব্যাহত থাকতে পারে বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে।
উত্তর-পূর্ব প্যারিসের লাইসি ভলতেয়ার উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে শুক্রবার সকালে কয়েক ডজন শিক্ষার্থী আবর্জনার বিনের ওপর বসে প্রবেশপথ আটকে দেন। সেখানে থাকা ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সোফিয়া বলেন, ‘আমরা চাই এটা একটি বড় যুব আন্দোলনে পরিণত হোক। আমরা শুধু চাই সরকার আমাদের কথা শুনুক। খারাপ পরিবেশে পড়াশোনা করার চেয়ে এখানে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করাই আমাদের কাছে ভালো। এটাই আমাদের কথা জানানোর একমাত্র উপায়।’
শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা একটি কার্ডবোর্ডে লেখা ছিল, ‘স্কুল কোনো সুবিধা নয়, এটি অধিকার।’
সোফিয়া বলেন, ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা সরকারি বিনিয়োগের ঘাটতি, ৪০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী নিয়ে অতিরিক্ত ভিড়ের ক্লাস, জরাজীর্ণ ভবন, শিক্ষকদের কম বেতন, কর্মীদের অনুপস্থিতি এবং সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল অসম শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জটিল ও অস্পষ্ট অনলাইন ব্যবস্থার পাশাপাশি মে ও জুনের তীব্র তাপপ্রবাহের সময় শ্রেণিকক্ষের অসহনীয় তাপমাত্রাও আন্দোলনের অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার বাজেটকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হচ্ছে, অথচ সেনাবাহিনীতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হচ্ছে।’ সোফিয়া ভবিষ্যতে শিল্প নিয়ে পড়াশোনা করে অ্যানিমেশন নিয়ে কাজ করতে চান। আগামী সপ্তাহেও বিক্ষোভ ও অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছেন তিনি। কয়েকজন শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের ব্যারিকেডের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো বলছে, দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা পর্যাপ্ত অর্থ পাচ্ছে না এবং দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে ছাদ আংশিক ধসে পড়া, পানি পড়া, তেলাপোকার উপদ্রব ও জরাজীর্ণ ভবনের অভিযোগ করেছেন। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাস এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার কথাও জানিয়েছেন।
তবে ফরাসি সরকার শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করলেও আন্দোলনের সময় ‘নগর সহিংসতার’ নিন্দা জানিয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে নিয়মিত কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে প্যারিসের দুটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথে আগুনে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। স্কুল দুটি হলো শহরের দক্ষিণের লিওনার দ্য ভিঞ্চি এবং দক্ষিণ-পূর্বের গাস্তোঁ-বাশেলার। বিক্ষোভে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৬৫ জন শিক্ষা কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন স্কুলপ্রধান রয়েছেন।
ভাল দ্য ওয়াজ অঞ্চলে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ তাকে মারধর করে এবং রাবার বুলেট নিক্ষেপকারী একটি অস্ত্র ব্যবহার করে। ওই কিশোরের পরিবারের আইনজীবী জানিয়েছেন, সে ভেবেছিল ‘আমি মারা যাব।’
লাইসি ভলতেয়ারের সামনে শুক্রবার দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন ছিল। তবে সেখানে কয়েকশ শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ ছিল শান্তিপূর্ণ। ১৭ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী ইভস বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি শান্তিপ্রিয়।’ তিনি জানান, ব্যারিকেডের বাইরে থেকে আসা কিছু মানুষ বিভিন্ন জিনিসে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাই তারা আগুন ঠেকাতে আবর্জনার বিনগুলো সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।
ইভস বলেন, ‘এই ব্যারিকেডে সাধারণত পরিবেশ খুব শান্ত। কিন্তু স্কুলের বাইরের কিছু মানুষ এসে জিনিসপত্রে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেছে।’
শুক্রবার সকালে স্কুলের কিছুটা দূরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইভস বলেন, আগের দিন প্রতি দুই মিনিট পরপর বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন তিনি। আকাশের দিকে না ছুড়ে অনুভূমিকভাবে এসব বস্তু ছোড়া হলে তা ‘ভীতিকর’ হয়ে ওঠে বলেও জানান তিনি। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানো ব্যক্তিরা তাদের স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন না বলে দাবি করেন তিনি।
১৮ বছর বয়সী ক্যামিল, যিনি ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে চান, বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার বিভিন্ন সূচকে ফ্রান্সের খারাপ ফলাফল নিয়েও শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করছেন। তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সের ফলাফল ভয়াবহ। অথচ আমরা সবচেয়ে বেশি সময় স্কুলে থাকা দেশগুলোর একটি। সরকার বুঝতে চায় না যে বিষয়টি পড়াশোনার সময়ের পরিমাণ নয়, শিক্ষার মানের।’
প্যারিসের আরও পূর্বদিকে লাইসি হেলেন বুশে উচ্চবিদ্যালয়ের সামনেও শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড তৈরি করেন। সেখানে তারা গান গাওয়ার পাশাপাশি গাজায় থাকা মানুষের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ড ধরেন। ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মেরিন ল্য পেনের বিরুদ্ধেও সেখানে ব্যানার দেখা যায়।
সেখানে সাহিত্য বিভাগের ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সোফিয়ান বলেন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা ১ ইউরোর খাবারের সুবিধা সরকার বাতিল করতে পারে এবং আবাসন সহায়তা কমিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও তাদের রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তীব্র গরমের সময়ের পরিস্থিতি নিয়েও আমরা প্রতিবাদ করছি। ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পরীক্ষা দেওয়া অসহনীয় ছিল। এমনকি শিক্ষকরাও বলেছিলেন, এটি অসম্ভব পরিস্থিতি।’
সোফিয়ান আরও বলেন, ‘তরুণরা শুধু ভালো পরিবেশে পড়াশোনা করতে চায়। ফরাসি সরকার শিক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে অবাক হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি পরিবর্তনে তারা কিছুই করছে না।’
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন চলতি সপ্তাহে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর ফরাসি সরকার নতুন করে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও স্কুল অবরোধ আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।