২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৫৮

২ দশক পর ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র 

ইরাক থেকে পুরোপুরিভাবে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  © সংগৃহীত

ইরাকে থাকা সর্বশেষ ঘাঁটিগুলো থেকে মার্কিন সেনা আগামী বুধবারের মধ্যে প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দশকের বেশি সময় ধরে অঞ্চলটিতে যুদ্ধ শেষে এই প্রত্যাহারকে ইরান ও দেশটির মিত্ররা বিজয় হিসেবে দেখছে। সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে ইরাকের চুক্তির মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালেও সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইরাক থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। খবর রয়টার্সের

ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ইরাকি ইসলামি প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও সম্মানিত ইরাকিদের ঐতিহাসিক বিজয় এবং আমেরিকার প্রকল্পের চরম পরাজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায় ইরানে কৌশলগত সুবিধা দেবে। কারণ, এতে দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে তেহরানের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষায় থাকা মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমে যাবে। ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘৩০ সেপ্টেম্বর আমরা ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের অবসান এবং আমাদের দেশের ওপর দখলদারত্বের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার ব্যর্থতা উদযাপন করব। ইরাক প্রমাণ করেছে, বিদেশি বাহিনীর মাধ্যমে নয়, বরং প্রতিরোধ ও জনগণের ইচ্ছার মাধ্যমেই দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।’

তবে ইরাকের সব পক্ষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে একইভাবে দেখছে না। দেশটির অনেক মানুষ বিদেশি সেনার উপস্থিতির বিরোধিতা করলেও ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর শক্তি নিয়ে উদ্বিগ্নরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে মার্কিন বাহিনীর চলে যাওয়া সময়োপযোগী নয়।

ফালুজার সুন্নি উপজাতীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরোপুরি নেওয়ার জন্য ইরাক এখনো প্রস্তুত নয়। সব ইরাকিই পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায় এবং এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু এভাবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট চলে গিয়ে যে শূন্যতা তৈরি হবে, সেটিই সব ইরাকির আশঙ্কা।’

২০০৩ সালে সুন্নি মুসলিম শাসক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর দেশটি দখলে নিয়ে শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে এবং কয়েক বছর ধরে বিদ্রোহ দমনে লড়াই করে। ২০১১ সালের শেষ দিকে মার্কিন সেনা ইরাক থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এর প্রায় তিন বছর পর ২০১৪ সালে সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করতে মার্কিন সেনারা আবার ইরাকে ফিরে আসে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চলা যুদ্ধে আইএসের নিয়ন্ত্রণ থেকে ইরাকের বড় অংশ পুনরুদ্ধার করা হয়।

ইরাকে মার্কিন ও ইরানি—দুই দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় ছিল। একই সঙ্গে দেশটি বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ সংঘাতের ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। এরপর ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একাধিকবার হামলা চালায়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

চলতি বছরের ইরানবিরোধী যুদ্ধে নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে ছিলেন। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে এরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোন নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় এক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট নিহত হন।

ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয়

ইরান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে নিজেদের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে দেখিয়ে আসছে। তাই ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে তেহরান তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম সোমবার বলেন, মার্কিন সেনারা ইরাক ও অঞ্চলটি থেকে চলে গেলে দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।

তিনি বলেন, ‘ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরান স্বাগত জানায় এবং নিঃসন্দেহে আমরা এটিকে সমর্থন করব। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে পদক্ষেপ নিচ্ছে, কখনো কখনো মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করছে এবং তাদের মোকাবিলা করছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানে সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তেহরানের নির্দেশে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতে ভূমিকা রাখছে। চলতি মাসে এসব গোষ্ঠী সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনেও হামলা চালিয়েছে বলে ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছে। তবে বাগদাদ সরকার বলছে, তারা এসব গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।