২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩০

ছাত্র আন্দোলনের মুখে আরও এক দেশের প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ  © সংগৃহীত

সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলছিল সার্বিয়ায়। এর সঙ্গে বাড়ছিল জনঅসন্তোষও। এমন পরিস্থিতির মুখে অবশেষে পদত্যাগ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের বাইরে সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণ দেন ভুচিচ। সেখানে তিনি বলেন, তার প্রায় নয় বছরের শাসনামলে তিনি দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছেন। এর আগে গত জুনে তিনি পদত্যাগের ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। এখন আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে নিজের দলের হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। তিনি ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হন। তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় সাত মাস আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।

ক্ষমতায় থাকাকালে ভুচিচের সরকারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সার্বিয়ার জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভী সাদ রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা সেই ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। ঘটনাটিকে ঘিরেই পরে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বড় আন্দোলন শুরু হয়।

এরপর ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে শ্রমিক ও কৃষকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। সংস্কারের পর নোভী সাদ রেলস্টেশনটি সার্বিয়ার অগ্রগতির প্রতীক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে ভুচিচের রাজনৈতিক দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির এক দশকের বেশি সময়ের শাসনের প্রকৃত চিত্র বলে মনে করেন বিরোধীরা।

দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পর জনরোষ কমিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে ভুচিচ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের একের পর এক কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। কিন্তু তাতেও বিক্ষোভকারীদের শান্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে পুরো গ্রীষ্মজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। আন্দোলন দমনে একপর্যায়ে সরকার পুলিশ মোতায়েন করলে পরিস্থিতি আরও অশান্ত হয়ে ওঠে।

ওই সময় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলা, নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। বিক্ষোভকারীরা ভুচিচ সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন। একই সঙ্গে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজনের আহ্বান জানান তারা। দীর্ঘদিন ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবির মধ্যে ছিল আগাম নির্বাচন।

ভুচিচের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করায় সার্বিয়ায় এখন নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। দেশটির আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হওয়ার তিন মাসের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।

এদিকে আগামী ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ায় আগাম সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে চলতি বছর দেশটির জনগণ দুই দফা ভোট দিতে পারেন। ভুচিচ জানিয়েছেন, অক্টোবরের সংসদীয় নির্বাচনের এক মাসের কিছু বেশি সময় পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে তার অবস্থান ধরে রাখার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তিনি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে গিয়ে সংসদীয় নির্বাচনের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পথ তৈরি করেছেন।

নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দেশটির সংসদের স্পিকার আনা ব্রনাবিচ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। সার্বিয়ার আইন অনুযায়ী, সংসদের স্পিকার সর্বোচ্চ তিন মাস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একই সময়ে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজনও করতে হবে।

সার্বিয়ার সরকারি গণমাধ্যম আরটিএসের তথ্যমতে, পদত্যাগের আগে ভুচিচ তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ৪৯ জনকে ক্ষমা করেছেন। তাদের মধ্যে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ২৩ জনও রয়েছেন। ক্ষমা পাওয়া এসব ব্যক্তির অনেকের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ছিল।

আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে ভুচিচের প্রগ্রেসিভ পার্টির সঙ্গে যেসব দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম ‘স্টুডেন্টস উইন’। সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে দলটি গঠিত হয়েছে। এ ছাড়া ‘ইউরোপিয়ান সার্বিয়া’ নামে পরিচিত আরেকটি জোট রয়েছে। এটি মূলত পশ্চিমাপন্থী বিরোধী দলগুলোর একটি জোট।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ভুচিচ সার্বিয়ার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৪ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। এর তিন বছর পর, ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। পরে ২০২২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এবার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি পদ ছাড়লেন।

ভুচিচ প্রকাশ্যেই বলে আসছেন, তিনি সার্বিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে যুক্ত করতে চান। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং চীনা বিনিয়োগের জন্যও সার্বিয়াকে উন্মুক্ত রাখতে চান তিনি। ফলে তার পররাষ্ট্রনীতিতে ইউরোপমুখী হওয়ার পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রসঙ্গত, বিগত কয়েক বছরে তীব্র যুব ও ছাত্র আন্দোলনের মুখে আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কারের প্রেসিডেন্ট, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, এছাড়াও নেপালের প্রধানমন্ত্রীও পদত্যাগ করেন। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা