২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭

বিশ্ববাজারে কমল জ্বালানি তেলের দাম

প্রতীকী ছবি  © সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধ ঘিরে চলমান উত্তেজনা নিরসনে চলতি সপ্তাহে কূটনৈতিক তৎপরতার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন আশায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা চললেও সৌদি আরব থেকে তেল সরবরাহ আংশিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টিও বাজারে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে বাড়লেও গতকাল রাতে একলাফে ২০ টাকা প্রতি লিটারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম । 

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে নেমে যায়। এতে আগের দিনের তুলনায় দাম কমেছে ২ দশমিক ১৬ ডলার বা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ। এর আগে শুক্রবার ব্রেন্টের দাম শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ কমেছিল। সোমবার ব্রেন্টের দাম ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ১৫ ডলার বা ২ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগের সেশনেও এর দাম ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমেছিল।

কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে চলতি সপ্তাহে কূটনৈতিক পথ তৈরি হতে পারে—এমন আশায় তেলের দামে ঝুঁকির প্রিমিয়ামের একটি অংশ কমে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই আশা বাস্তবে কতটা যুক্তিসংগত, সেটি আরেকটি প্রশ্ন। সময়ই তা বলে দেবে।’

সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক ব্রোকার জানিয়েছে, ডব্লিউটিআইয়ের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচে নেমেছে। পাশাপাশি কিছু বিনিয়োগকারী মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিন আগে অক্টোবর চুক্তির অবস্থান নভেম্বরের চুক্তিতে স্থানান্তর করে থাকতে পারেন।

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অচলাবস্থার মধ্যেই রবিবার নতুন করে হুমকি-পাল্টা হুমকি দেওয়া হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে আসতে পারেন এমন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বসতে তিনি আগ্রহী।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনায় ফেরার বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নিজেদের শর্ত জানিয়েছে ইরান। শনিবার এক সাক্ষাৎকারে দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই এ কথা জানিয়েছেন।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা জানিয়েছে, শনিবার তারা সৌদি রাজধানী রিয়াদের ‘সংবেদনশীল’ স্থাপনা এবং লোহিত সাগরের তীরবর্তী তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

তিন ইরানি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হামলার পর সৌদি আরব চীনের কাছে আহ্বান জানালে বেইজিং ইরানকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে সহযোগিতা করতে বলেছে।

হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো চলতি মাস ও আগামী মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। এর ফলে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে কিছু চালান বন্ধ থাকার পরও সৌদি আরবের তেল রপ্তানি আংশিকভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি দৈনিক ২৪ লাখ ব্যারেলে নেমে গিয়েছিল, যা অন্তত ২০১৩ সালের পর সর্বনিম্ন। তবে সেপ্টেম্বরের এখন পর্যন্ত তা বেড়ে দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে।

জেপিমরগ্যানের বিশ্লেষকেরা ১৮ সেপ্টেম্বরের এক নোটে বলেছেন, ‘সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে বিঘ্ন থাকা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ আশ্চর্যজনকভাবে শক্তিশালী রয়েছে।’ তাদের হিসাবে, গত ১০ দিনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মোট তেল সরবরাহের পরিমাণ গড়ে দৈনিক ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল হয়েছে। যা ২০২৫ সালের গড়ের তুলনায় মাত্র ৬১ লাখ ব্যারেল কম।

বিশ্লেষকেরা আরও বলেন, ‘সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে সৌদি আরব থেকে।’ স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল পরিবহনের পরিমাণ গড়ে দৈনিক ২৯ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। আগস্টে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ লাখ ব্যারেল।

অবশ্য বিশ্ববাজারে কমলেও দেশের বাজারে জ্বালানির দাম আরও একদফা বাড়ানো হয়েছে। গতকাল রাতে সব ধরণের জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে সরকার। তাতে গতকাল মধ্যরাত থেকে ইতিহাসে সর্বোচ্চ দামে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। এর আগে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছে।