২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৬

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ-সংঘাতের মধ্যেই এল শান্তি দিবস, এটি কেন পালন করা হয়

গাজায় ফিলিস্তিনি শিশু, ২০১৪  © টিডিসি সম্পাদিত

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত চলার মধ্যেই আজ ২১ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত, সুদানের গৃহযুদ্ধ, মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং ইয়েমেনের চলমান লড়াইয়ে এখনো প্রাণ হারাচ্ছেন বেসামরিক মানুষ। সিরিয়া, কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলসহ আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের বিভিন্ন দেশেও সশস্ত্র সহিংসতা ও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে ২ লাখ ৪ হাজারের বেশি সংঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যাতে ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

এই বাস্তবতায় যুদ্ধ বন্ধ, সহিংসতা কমানো এবং মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ৫৫/২৮২ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ২১ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে। একই প্রস্তাবে দিনটিকে বৈশ্বিক যুদ্ধবিরতি ও অহিংসার দিন হিসেবে পালনের আহ্বান জানানো হয়। বিশ্বজুড়ে ‘বিশ্ব শান্তি দিবস’ নামেও পরিচিত এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো শান্তির আদর্শকে শক্তিশালী করা এবং সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ ও সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করা।

কেন পালন করা হয়?

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস শুধু যুদ্ধ না থাকার বার্তা দেয় না। মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে। জাতিসংঘের লক্ষ্য অনুযায়ী, এই দিনটি শান্তির আদর্শকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি যুদ্ধ ও সহিংসতার অবসানের বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির সুযোগ করে দেয়।

বিশ্বের কোনো অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব শুধু ওই দেশের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল, খাদ্য ও জ্বালানির সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং মানবিক বিপর্যয় সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশেও প্রভাব ফেলে। সংঘাতের কারণে শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারও ব্যাহত হয়। ফলে শান্তি এখন শুধু কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সমাজেরও যৌথ দায়িত্ব।

জাতিসংঘ মনে করে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় দারিদ্র্য, বৈষম্য, বৈষম্যমূলক আচরণ ও অবিচারের মতো সহিংসতার সম্ভাব্য কারণগুলো মোকাবিলা করাও গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে উন্নয়ন, মানবাধিকার, সমতা ও সামাজিক সংহতির বিষয়গুলোও তাই গভীরভাবে যুক্ত।

যেভাবে শুরু হয়েছিল শান্তি দিবস

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৮১ সালে। ওই বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৩৬/৬৭ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ পরিষদের নিয়মিত অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনকে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথম শান্তি দিবস পালিত হয় ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে। তখন দিনটির নির্দিষ্ট তারিখ ছিল না; সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর তৃতীয় মঙ্গলবার দিনটি পালিত হতো।

পরে ২০০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৫৫/২৮২ নম্বর প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে দিনটিকে বৈশ্বিক যুদ্ধবিরতি ও অহিংসার দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০২ সাল থেকে নির্ধারিত ২১ সেপ্টেম্বরেই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

শান্তির ঘণ্টার সঙ্গে দিবসটির সম্পর্ক কী?

জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের অন্যতম প্রতীক ‘জাপানি শান্তির ঘণ্টা’ বা ‘Peace Bell’। ১৯৫৪ সালের ৮ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ঘণ্টাটি পৌঁছায়। এটি জাতিসংঘ অ্যাসোসিয়েশন অব জাপানের উপহার। বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মানুষের দেওয়া মুদ্রা ও পদক দিয়ে ঘণ্টাটি তৈরি করা হয়েছিল।

প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর শান্তি দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এই ঘণ্টা বাজানোর ঐতিহ্য রয়েছে। ঘণ্টাটি শান্তির প্রতীক হিসেবে যুদ্ধ ও সংঘাতের ভয়াবহতার বিপরীতে শান্তির প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

শুধু যুদ্ধ বন্ধ নয়, শান্তির পরিধি আরও বড়

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের আলোচনা শুধু যুদ্ধ বন্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সহিংসতা থেকে শিশুদের সুরক্ষা, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, বৈষম্য কমানো এবং সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান করাও শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করা সংগঠনগুলো এ দিনকে ঘিরে নানা কর্মসূচি আয়োজন করে। শিক্ষা ও জনসচেতনতার মাধ্যমেও শান্তির আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রতিবছর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস ফিরে আসে। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতার বাস্তবতাও রয়ে যায়। তাই ২১ সেপ্টেম্বর শুধু একটি দিবস পালনের দিন নয়; বরং যুদ্ধের বদলে সংলাপ, প্রতিশোধের বদলে সমঝোতা এবং ধ্বংসের বদলে মানুষের জীবন ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানোর দিন।