ইরান যুদ্ধে ৫০টিরও বেশি মূল্যবান যুদ্ধবিমান ও ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: পেন্টাগন
ইরানে মার্কিন আগ্রাসন শুরুর পর থেকে তেহরানের সামরিক শক্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করে আসছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এ দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন। সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অভিযানে ৩.২ বিলিয়ন ডলারের ৫০টিরও অধিক যুদ্ধবিমান হারিয়েছে ওয়াশিংটন। খবর আল জাজিরার
প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানিয়েছে, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনসহ কয়েক ডজন উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির ব্যবহৃত শত শত ভবন ও স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রথম সরকারি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে এসেছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিভিন্ন সংকট তৈরি হয়েছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের ঘাটতির খবর প্রত্যাখ্যান করে দেশটির অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতার প্রশংসা করেছিলেন। সোমবারও তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ‘আরও বেশি উন্নত ও অত্যাধুনিক অস্ত্র’ উৎপাদন করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, নজরদারি বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। যেখানে অন্তত চারটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ১ মার্চ কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর গুলিতে এবং একটি এপ্রিলে ইরানের ওপর অভিযান চলাকালে ধ্বংস হয়। এছাড়া ১টি এফ-৩৫এ, স্থল হামলায় ব্যবহৃত ১টি এ-১০ যুদ্ধবিমান, ৭টি জ্বালানি সরবরাহকারী ফুয়েল ট্যাংকার ধ্বংস হয়েছে। যার একটি বিধ্বস্ত হয়ে ৬ ক্রু সদস্য নিহত হন।
পাশাপাশি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে একটি ই-৩ সেন্ট্রি, ১টি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টার, ২৪ কোটি ডলার সমমূল্যর উচ্চ-উচ্চতার নজরদারি ক্ষমতাসম্পন্ন এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন, ইরানে স্থল অভিযানে যাওয়া সেনা সদস্যদের উদ্ধারে গিয়ে চারটি এএইচ-৬ মডেলের ছোট হেলিকপ্টার, আর হরমুজ প্রনালির কাছে এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি মডেলের একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়েছে।
এছাড়া আরব সাগরে এমএইচ-৬০এস মডেলের একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি এমকিউ-৯ রিপার মডেলের ৩০ টি নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত ড্রোন হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের সামরিক বাহিনী অবশ্য দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি নজরদারি ও হামলাকারী ড্রোন ভূপাতিত করেছে। চলতি মাসের শুরুতে ইরান একটি মার্কিন চালকবিহীন সাবমার্সিবল ‘ডাইভ-এলডি’ আটক করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি সৈন্যও হারিয়েছে ওয়াশিংটন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ সংঘাতে অন্তত ১১ মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। এর বাইরে ভুল হামলায় আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানের হামলায় অন্তত ৪১৭ মার্কিন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন।
ইরানের হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের হামলার কারণে কয়েকটি মার্কিন স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোও ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক ব্যয় ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ইরাকে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোতে ৩০ জুন পর্যন্ত ৬০০টির বেশি হামলা হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কুয়েতে আঞ্চলিক উত্তেজনা, হামলা ও দূতাবাসের ক্ষয়ক্ষতির কারণে ৫ মার্চ মার্কিন দূতাবাসের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এতে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার ক্ষতি হয়েছে। ৩ মার্চ সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে দুটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। এতে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এ ছাড়া দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলের একটি ইউটিলিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।