১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০৯

কেমোথেরাপি নেওয়ার ১১ বছর পর জানা গেল ক্যান্সারই ছিল না সেই নারীর

১১ বছর ধরে ভুল চিকিৎসায় ক্ষতিগ্রস্ত বেকি জোনস  © টিডিসি ছবি

১ বছর নয়, ২ বছর নয় টানা ১১ বছর ধরে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন এক নারী। তবে হঠাৎ একদিন তিনি জানতে পারলেন তার শরীরে কখনোই ক্যান্সার ছিল না। এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে খোদ যুক্তরাজ্যে। মাত্র ২১ বছর বয়সে বেকি জোন্সকে জানানো হয়েছিল, তার মস্তিষ্কে প্রাণঘাতী টিউমার হয়েছে এবং বাঁচার জন্য হাতে রয়েছে মাত্র কয়েক মাস। এরপর টানা ১১ বছর কেমোথেরাপি নিয়েছেন তিনি। কিন্তু ৩৪ বছর বয়সে এসে জানতে পারেন, তার আদৌ ক্যানসার ছিল না। তিনি আক্রান্ত ছিলেন মস্তিষ্কের এক ধরনের প্রদাহে, যা স্টেরয়েড ওষুধে চিকিৎসাযোগ্য। খবর বিবিসির

বেকি জোন্স বর্তমানে দুই সন্তানের মা। তার অভিযোগ, ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় তাকে অপ্রয়োজনীয় ক্যানসার চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এতে নিয়মিত বমি বমি ভাব, পেটব্যথা, মুখে ঘা ও অতিরিক্ত ক্লান্তির পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকেও দূরে থাকতে হয়েছে তাকে। এমনকি তার কর্মজীবনও বাধাগ্রস্ত হয়।

বেকির মতো ৪০ জনের বেশি রোগী যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার (ইউএইচডব্লিউ) এনএইচএস ট্রাস্টের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় দীর্ঘ সময় বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্যানসারের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

বেকি বলেন, ‘আমাকে বারবার বলা হয়েছিল, কেমোথেরাপি না নিলে আমি মারা যাব।’

২০১২ সালে কভেন্ট্রি সিটি স্টেডিয়ামে সিসিটিভি অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন বেকি। সেখানেই তার পরিচয় হয় পিটের সঙ্গে। দুজনের সম্পর্কও তৈরি হয়। তবে এর কিছুদিন পর বেকির প্রচণ্ড মাইগ্রেন শুরু হলে তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

একজন বেসরকারি নিউরোসার্জন তার মস্তিষ্কের বায়োপসি করেন। তবে আইনজীবী ফিওনা টিনসলে জানিয়েছেন, বায়োপসির ফল হাতে আসার আগেই কভেন্ট্রির ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ইয়ান ব্রাউন বেকির মস্তিষ্কে গ্রেড-৪ গ্লিওব্লাস্টোমা শনাক্ত করেছিলেন। এটি মস্তিষ্কের অন্যতম আক্রমণাত্মক ক্যানসার।

এরপর বেকিকে টেমোজোলোমাইড (টিএমজেড) নামের কেমোথেরাপির ওষুধ দেওয়া হয়। তিনি জানান, অধ্যাপক ব্রাউন তাকে বলেছিলেন, জীবনের বাকি সময় তাকে এই ওষুধ নিতে হবে। অথচ চিকিৎসা নির্দেশিকায় সাধারণত ছয় মাসে ছয়টি সাইকেল কেমোথেরাপির সুপারিশ করা হয়। বেকির দাবি, একাধিক স্ক্যানে টিউমারের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায় তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তখন তাকে বলা হয়, টিউমারটি খালি চোখে দেখা যাবে না।

২০২৫ সালে ওই হাসপাতালে অধ্যাপক ব্রাউনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্যানসারের রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে পর্যালোচনা শুরু হলে বেকি প্রথম জানতে পারেন, তার রোগ নির্ণয়ই ভুল ছিল। তিনি বলেন, ‘আমার কখনোই মস্তিষ্কে টিউমার ছিল না। আমার ভুল রোগ নির্ণয় করা হয়েছিল এবং আমার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বড় একটি সময় অকারণে এই চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই ডাক্তার মূলত আমার জীবনটাই নষ্ট করে দিয়েছে।’

বিবিসিকে অধ্যাপক ইয়ান ব্রাউনের আরও অনেক রোগী জানিয়েছেন, তাদেরও বছরের পর বছর টিএমজেড দেওয়া হয়েছে। এতে কেউ গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েছেন। এক রোগী মনে করেন, ওই ওষুধের কারণে তিনি সন্তান ধারণের ক্ষমতা হারিয়েছেন। আরেক রোগী অপ্রয়োজনীয়ভাবে ১০০টি কেমোথেরাপি সাইকেল নেওয়ার পর লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হন।

রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের (আরসিপি) প্রাথমিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ওই হাসপাতালে রোগীদের নিয়মিতভাবে দীর্ঘ সময় টিএমজেড দেওয়া হয়েছে, অথচ এর উপকারিতার পক্ষে ‘সামান্য বা কোনো প্রমাণই ছিল না’।

পর্যালোচনায় হাসপাতালের কর্মীদের ব্যর্থতাকে ‘রোগীর আস্থার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে নিয়মিত মুখে খাওয়ার কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে অনকোলজি ফার্মেসি টিম কেন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, তা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে।

বেকি জানান, বছরের পর বছর কেমোথেরাপি নেওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ। সব সময় বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা, মুখে ঘা, প্রতিদিনের ক্লান্তি—সবকিছুই ভয়াবহ ছিল।’

সংক্রমণের আশঙ্কায় তাকে সামাজিক অনুষ্ঠান ও পারিবারিক জমায়েত এড়িয়ে চলতে হতো। চিকিৎসার শুরুতে তার গাড়ি চালানোর লাইসেন্সও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেটিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় । বেকি বলেন, ‘চিকিৎসা শুরুর আগে আমি নিয়মিত জিমে যেতাম, দৌড়াতাম। আমি আর পিট প্রায়ই বাইরে খেতে যেতাম। কিন্তু পরে এসব কিছুই করতে পারিনি।’

চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে তাকে বলা হয়েছিল, তিনি সন্তান ধারণ করতে পারবেন না। কিন্তু পরবর্তীতে বেকির দুটি সন্তান হয়।

২০২৪ সাল পর্যন্ত তার চিকিৎসা চলতে থাকে। ওই বছর হঠাৎ এক চিকিৎসক ফোন করে জানান, তার কেমোথেরাপি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বেকির ভাষ্য, ‘এর কোনো কারণ তিনি আমাকে বলেননি। শুধু বলেছিলেন, ইয়ান ব্রাউন অবসর নিয়েছেন। তখনই প্রথম আমি বিষয়টি জানতে পারি।’

নতুন কোনো অনকোলজিস্টের কাছে তার সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বলে জানানো হলেও তার নাম তাকে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না কী করব, কোথায় যাব বা কার সঙ্গে কথা বলব। ওই সময় হাসপাতাল থেকেও কোনো সহায়তা পাইনি।’

গেল বছরের মে মাসে বেকির আইনজীবীদের উদ্যোগে নিউরোসার্জন ও রেডিওলজিস্টদের স্বাধীন বিশ্লেষণ করা হয়। তখন তাকে জানানো হয়, তার কখনোই মস্তিষ্কে ক্যানসার ছিল না।

তিনি আসলে ‘টিউমেফ্যাকটিভ ডিমাইলিনেশন’ নামের এক ধরনের প্রদাহে আক্রান্ত ছিলেন। এ ধরনের রোগ সাধারণত নিউরোলজিস্টরা চিকিৎসা করেন এবং শক্তিশালী স্টেরয়েড ওষুধ দিয়ে এর চিকিৎসা করা হয়।

আইনজীবীদের সঙ্গে ভিডিও কলে ওই খবর জানতে পারেন বেকি। তার আইনজীবী ফিওনা টিনসলে বলেন, ‘যখন আমরা বিষয়টি জানতে পারি, তখন সবার চোখে পানি ছিল।’

এদিকে এমন চাঞ্চল্যকর দাবির মধ্যেই আরসিপির পর্যালোচনায় অধ্যাপক ইয়ান ব্রাউনের নাম উল্লেখ করা না হলেও তাকে ‘ড. ওয়াই’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যালোচনা করা ২০টি মামলার মধ্যে ১৫টিকে সামগ্রিকভাবে ‘অসন্তোষজনক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই কনসালট্যান্ট নিজে পর্যালোচনায় অংশ নেননি। পর্যালোচনা কমিটি বলেছে, টিএমজেড ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে রোগীদের বোঝানো এবং তা নথিভুক্ত করার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।কিছু ক্ষেত্রে ‘যথেষ্ট ক্লিনিক্যাল কৌতূহলের অভাব’ ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে সম্ভাব্য রোগ নির্ণয়ের ভুল দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পেরেছে।

এসব তথ্যকে ‘ভীতিকর’ বলে বর্ণনা করেছেন বেকি । তিনি বলেন, ‘বিষয়টি শুধু সে কী করেছে তা নয়, বরং এত দীর্ঘ সময় তাকে নিজের মতো করে কাজ করতে দেওয়া হলো কীভাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। মনে হচ্ছিল, সে নিজের মতো করে সবকিছু পরিচালনা করছিল এবং তাকে পর্যবেক্ষণ করার মতো কেউ ছিল না।’

### আরও তদন্ত করবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার এনএইচএস ট্রাস্ট জানিয়েছে, তারা ব্যক্তিগতভাবে কোনো রোগীর বিষয়ে মন্তব্য করবে না। তবে টিএমজেড ওষুধের প্রেসক্রিপশন এবং ব্যবহারের ওপর আরও শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ট্রাস্টের একজন মুখপাত্র বলেন, আক্রান্ত সব রোগীকে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং তাদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।

এ ছাড়া কর্মীরা যাতে কোনো অনিয়ম বা উদ্বেগের বিষয় নির্ভয়ে তুলে ধরতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে তাদের ‘স্পিক-আপ’ ব্যবস্থারও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ট্রাস্ট জানিয়েছে, রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রকাশিত হলে সেটি মূল্যায়ন করা হবে এবং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ট্রাস্টের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, রোগীদের নিরাপত্তা, অভিজ্ঞতা ও সুস্থতাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।