আজ আন্তর্জাতিক চকলেট দিবস, কেন এত জনপ্রিয় চকলেট—জানুন ইতিহাস
আজ ১৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক চকলেট দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে চকলেট দিবস পালিত হওয়ায় বছরে একাধিকবার আসে ‘চকলেট ডে’। ১৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ‘ইন্টারন্যাশনাল চকলেট ডে’ হিসেবে পরিচিত। দিনটি চকলেট উদ্যোক্তা মিল্টন এস. হার্শের জন্মদিনের সঙ্গেও মিলে যায়। তিনি ১৮৫৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ‘ওয়ার্ল্ড চকলেট ডে’ পালিত হয় ৭ জুলাই। ২০০৯ সাল থেকে এই দিবস পালনের প্রচলন শুরু হয়। ধারণা করা হয়, ১৫৫০ সালের দিকে ইউরোপে চকলেট পৌঁছানোর ঘটনাকে স্মরণ করেই ৭ জুলাই তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছে।
চকলেটের স্বাদ প্রথম পেয়েছিল লাতিন আমেরিকার মায়া সভ্যতা। নামটিও এসেছে তাদের ভাষার ‘স্কোকোলেট’ থেকে। যার অর্থ অম্ল পানীয়। কোকো গাছের বীজ থেকে প্রস্তুত চকলেট গোড়ার দিকে মূলত পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সে আমলে অনেকে আবার এটি রান্নার মসলা হিসেবেও ব্যবহার করতেন। তখন কেবল মায়া রাজ পরিবারের সদস্য, প্রশাসক, ধর্মগুরু, সৈনিক এবং সম্মানীয় বণিক সম্প্রদায়ই একমাত্র এর স্বাদ আস্বাদন করতে পারতেন।
পরে মায়াদের কাছ থেকে চকলেটের ব্যবহার শিখে নেয় আজটেকরা। তাদের আরাধ্য দেবতা কোয়েটজালকটলই নাকি এই কোকো গাছ পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলেন। এই গাছের ফল খেলে সাম্রাজ্য এবং ক্ষমতা দুই-ই জয় করা যায়—এমনই বিশ্বাস ছিল আজটেকদের।
আধুনিক চকলেটের প্রথম কারখানা গড়ে ওঠে স্পেনে। জানা যায়, জর্জ ক্যাডবেরি (জুনিয়র) স্পেন থেকে ক্যাডবেরি বারের রেসিপি শিখে এসে প্রথম এটি তৈরি করেন ১৯০৫ সালে। বর্তমানে চকলেট দুনিয়ার অনেক দেশেই বিখ্যাত। এদের মধ্যে বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ইতালি চকলেটের জন্য বেশি বিখ্যাত। নিউহস, লিন্ডট, লিওনিদাস, হারশে’স, ফেরারো, ক্যাডবেরি ইত্যাদি চকলেটের বিখ্যাত ব্র্যান্ড।
ভ্যালেন্টাইন সপ্তাহের প্রতিটি দিনেরই রয়েছে নিজস্ব মাহাত্ম্য। তবে ৯ ফেব্রুয়ারির দিনটি একটু আলাদা। ‘চকোলেট ডে’। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন এই চকোলেটকেই ভালোবাসার অন্যতম প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হলো? আর কবে থেকেই বা শুরু হল এই বিশেষ দিনটি পালনের রেওয়াজ?
চকোলেট ডের ইতিহাস খুঁজতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে ভিক্টোরিয়ান যুগে। যদিও প্রাচীন আজটেক এবং মায়া সভ্যতায় চকোলেটকে ‘দেবতাদের খাবার’ মনে করা হত, কিন্তু প্রেমের সঙ্গে এর সরাসরি সংযোগ ঘটে উনিশ শতকে। ১৮৪০-এর দশকে প্রখ্যাত চকোলেট প্রস্তুতকারক রিচার্ড ক্যাডবেরি প্রথম বিপণনের খাতিরে ভ্যালেন্টাইন সপ্তাহের কথা মাথায় রেখে চকোলেটের বাক্স তৈরি করেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, রোমান্টিক এই সপ্তাহে মানুষ বিশেষ কিছু খুঁজছে। এরপরই ১৮৬৮ সালে তিনি বাজারে আনেন ‘হৃদয় আকৃতির চকোলেট বক্স’।
ধীরে ধীরে সেই বিশেষ বাক্সগুলো উপহার হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রেমিক-প্রেমিকারা চকোলেট শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেই সুন্দর বাক্সগুলোতে প্রেমপত্র বা ছোটখাটো স্মারক জমিয়ে রাখতে শুরু করেন। ধারণা করা হয়, রিচার্ড ক্যাডবেরির এই বাণিজ্যিক উদ্ভাবনই আধুনিক ‘চকোলেট ডে’-র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
কেন চকোলেটই সেরা পছন্দ? ইতিহাসবিদদের মতে, রিচার্ড ক্যাডবেরির আগে থেকেই চকোলেটের সঙ্গে বিলাসিতা ও রোমান্টিকতার যোগ ছিল। ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই তাঁর প্রেমিকাদের চকোলেট উপহার দিতেন বলে শোনা যায়। আবার প্রখ্যাত ইতালীয় প্রেমিক ক্যাসানোভাও বিশ্বাস করতেন যে, চকোলেট মানুষের মনে উদ্দীপনা বাড়াতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানও কিন্তু পিছিয়ে নেই। গবেষকরা জানিয়েছেন, চকোলেট খাওয়ার ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিন ও এন্ডোরফিন নির্গত হয়, যা মানুষকে আনন্দিত রাখে এবং মানসিক চাপ কমায়। সম্ভবত এই কারণেই চকোলেট ডে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শুরুতে কেবল উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বিংশ শতাব্দীতে চকোলেট ডের উদযাপন সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপে এর প্রসার সবচেয়ে বেশি হলেও, গত কয়েক দশকে এশিয়া ও ভারতে এটি একটি বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে শুধু প্রিয়জন নয়, বরং বন্ধুদের মধ্যে ‘হ্যাপিনেস’ ভাগ করে নিতেও চকোলেট ডে পালন করা হয়।
আজকের বাজারে ডার্ক চকোলেট থেকে শুরু করে নাম লেখা কাস্টমাইজড চকোলেটের যে বিপুল সম্ভার আমরা দেখি, তার মূল সুরটি কিন্তু সেই ভিক্টোরিয়ান যুগের আভিজাত্য থেকেই ধার করা। তাই ৯ ফেব্রুয়ারি মানেই এখন শুধু মিষ্টি মুখ নয়, বরং দেড়শ বছর পুরোনো এক ঐতিহ্যের উদযাপন।
তবে দেশ ভেদে চকলেটের দিবস নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি, ‘চকলেট’ দিবস পালন করা হলেও বিশ্বের কিছু ক্যালেন্ডার ভিন্ন কথা বলছে। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৯ ফেব্রুয়ারি ছাড়া ৭ জুলাই ‘বিশ্ব চকলেট দিবস’ পালন করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ সেপ্টেম্বরকে ‘ইন্টারন্যাশনাল চকলেট ডে’-এর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ব্রিটেনে ২৮ অক্টোবর দেশটির বাসিন্দারা ‘জাতীয় চকলেট দিবস’ পালন করে। হালকা তেতো-মিষ্টি চকলেটের দিবস ১০ জানুয়ারি, দুধের স্বাদের চকলেট ডে’র জন্য ২৮ জুলাই, সাদা রঙের চকলেট ডে’র জন্য ২০ সেপ্টেম্বর, টুকরো টুকরো চকলেটের জন্য ১৫ মে, আইসক্রিম চকলেটের জন্য ৭ জুন, চকলেট মিল্ক সেকের জন্য ১২ সেপ্টেম্বর দেখা যায় বিশ্বের বিভিন্ন ক্যালেন্ডারে। এছাড়াও যেকোনো উপকরণ দিয়ে সাজানো চকলেট ডে’র জন্য ১৬ ডিসেম্বর।