গুরুত্বপূর্ণ আরেক প্রণালির দখল নিচ্ছে হুতিরা, তেলের দামে বড় উত্থানের শঙ্কা
ইরানঘনিষ্ঠ হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখলে নিয়েছে। হরমুজ প্রণালির পর কৌশলগত আরেক প্রণঅরি বাবে আল মান্দেব দখল নিয়ে সৌদি আরবের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) তারা লোহিত সাগরের উপকূল ধরে কৌশলগত কয়েকটি দ্বীপের দিকে অগ্রসর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর শেষ হতে পারে বলে মন্তব্য করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হুতিদের এই অগ্রযাত্রার খবর এলো। খবর বিবিসির
ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, হুতিরা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়েছে। তারা হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও পৌঁছেছে।
হুতিরা যদি আরব উপদ্বীপের অপর পাশে অবস্থিত হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তাহলে ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে। এতে দ্বিতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ দিয়ে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া এমন পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথও কঠিন করে তুলতে পারে। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার রিপাবলিকান পার্টির ওপরও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। হুতিদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য লোহিত সাগরে নৌ চলাচল নিরাপদ।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব লোহিত সাগরের নৌপথের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ইয়েমেন সরকারের সামরিক বাহিনী ও তাদের মিত্ররা লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণে বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে ধুবাবের দিকে সরে যাচ্ছে বলে সরকারি সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। ধুবাব ও এর বিপরীতে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নৌপথটির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা জানিয়েছে।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বলেছেন, ইয়েমেনের যুদ্ধ ‘নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে’ প্রবেশ করায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মোখা দখলের ফলে হুতিরা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপ্রণালির প্রবেশপথে সরাসরি উপস্থিতি তৈরি করেছে উল্লেখ করে তিনি নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নিধার্ট দে অর্টিজ হুতিদের ‘ইরানের এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই উত্তেজনা বৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য নয় এবং যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে, তাদের এর পরিণতির দায় নিতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে অবরোধ বা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইয়েমেনের সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়। তারা সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে।
ইয়েমেন সরকার, ইরান ও আঞ্চলিক কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে হুতিদের উপকূল ধরে অগ্রসর হওয়ার ঘটনায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তবে হুতি মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেছেন, তাদের অভিযান আত্মরক্ষামূলক এবং ইয়েমেনের ওপর হামলা বন্ধ হলে তা থেমে যাবে।
হুতিদের নতুন বন্দর দখলের খবরে নৌপথে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দাম প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব জ্বালানির মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডি।
মার্চে ইসরায়েলের ওপর হামলার মাধ্যমে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে হুতিরা। চলতি মাসে তারা হামলা আরও জোরদার করেছে।
এদিকে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতে ২৪ ঘণ্টায় চতুর্থবারের মতো জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হুতিদের হামলার মধ্যে সেখানে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পাকিস্তান ইরানকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র জানিয়েছে। জবাবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ইরান হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।’
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার সবচেয়ে বড় ঢেউয়ের মধ্যেই ইয়েমেনে এই লড়াই চলছে। এদিকে ইরানের যুদ্ধের অর্থায়ন বন্ধ করতে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় বৃহস্পতিবার হিজবুল্লাহ ও ইরানসমর্থিত অন্যান্য গোষ্ঠীকে সহায়তাকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়।