অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ
অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। বুধবার তিনি সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়েসুসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। সায়মা ওয়াজেদ বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স তার পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিরুদ্ধে তাকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে প্রায় এক বছর বেতন ছাড়া ছুটিতে থাকায় তার আর্থিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়ম এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এসব অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন তিনি।
চলতি বছরের ৩ জুলাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দেওয়া এক চিঠিতে সায়মা ওয়াজেদের আইনজীবীরা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার অবস্থান জানান।
চিঠিতে বলা হয়, চীন সফরকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। নিয়মিত ভ্রমণ খরচ ফেরত পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়ায় একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে বিষয়টি ঘটেছিল বলে দাবি করেন সায়মা ওয়াজেদ। ওই অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ ডলার। জুলাইয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দেওয়া চিঠিতেও তিনি ভ্রমণসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন।সায়মা ওয়াজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও অভিযোগ তদন্ত করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
এ বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একটি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। এ যোগ্যতার বিষয়টি তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়েসুসকে জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন। তার আইনজীবীদের মাধ্যমে দেওয়া চিঠিতে অভিযোগগুলোকে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ আরও একটি অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশে একটি জমির প্লট অবৈধভাবে অধিগ্রহণের অভিযোগ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। সায়মা ওয়াজেদের দাবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগেই তিনি ওই জমি অধিগ্রহণ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য একটি আইনের আওতায় তিনি ওই জমির অধিকারী হয়েছিলেন বলেও পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন এ অনুসন্ধান শুরু করার এক পর্যায়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সায়মা ওয়াজেদকে প্রথমবার বেতন ছাড়া ছুটিতে পাঠায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এরপর বুধবার পর্যন্ত তিনি বেতন ছাড়া ছুটিতেই ছিলেন।
পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, প্রায় এক বছর কোনো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তার আর্থিক পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনে তাকে বাধা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের নেতৃত্বের ওপর তার আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে গেছে।
পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, আঞ্চলিক পরিচালক পদে তিনি তার অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সায়মা ওয়াজেদ এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। গত মাসে সংস্থাটি জানিয়েছিল, সায়মা ওয়াজেদ ছুটিতে আছেন। তবে গোপনীয়তার স্বার্থে তার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল সংস্থাটি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্যদেশগুলোর ভোটে আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের জন্য তিনি এই পদে দায়িত্ব নেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালকদের বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রোগের প্রাদুর্ভাব ও জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়া তাদের অন্যতম দায়িত্ব। এ ছাড়া স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতি বাস্তবায়নেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারত রয়েছে। সদস্যদেশগুলো প্রতি পাঁচ বছর পর আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচন করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১২ অক্টোবর এই পদের জন্য মনোনয়ন ঘোষণা করা হতে পারে। এরপর ডিসেম্বরে প্রার্থীদের আবেদন যাচাই-বাছাই শেষ করার কথা রয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষে আগামী ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।