দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থীদের জয়, চাপে চ্যান্সেলর
জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (আফডি)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো উগ্র ডানপন্থী দল জার্মানির কোনো রাজ্যে ক্ষমতার এতটা কাছাকাছি পৌঁছাল। তবে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি দলটি। নির্বাচনের এই ফলে চাপে পড়েছে দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস ও তার নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে।
প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (আফডি) প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় নিশ্চিত করেছে। ফল ঘোষণার পর দলটির নেতাকর্মী ও প্রধান প্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ডকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, পিঠ চাপড়ে দিয়ে এই ফলকে ‘ঐতিহাসিক’ বিজয় হিসেবে উদ্যাপন করেন।
এই ফলাফলে ৮৩ সদস্যের রাজ্য পার্লামেন্টে আফডি ৩৯টি আসন পেয়েছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ৪২টি আসন। অর্থাৎ সরকার গঠনের খুব কাছাকাছি পৌঁছালেও এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো আসন পায়নি দলটি।
আফডির সরকার গঠনের সম্ভাবনা এখন জোটের সমীকরণের ওপর নির্ভর করছে। এ ক্ষেত্রে বামপন্থী সাহরা ওয়াগেনকনেখট অ্যালায়েন্স (বিএসডব্লিউ) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দলটি প্রয়োজনীয় ৫ শতাংশ ভোটসীমা পেরিয়ে রাজ্য পার্লামেন্টে প্রবেশ করেছে। তবে আফডি ইতোমধ্যে বিএসডব্লিউর সঙ্গে জোটে যাওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহের কথা জানিয়েছে।
ঐতিহাসিক মুহূর্ত দাবি আফডির
নির্বাচনের আগে থেকেই স্যাক্সনি-আনহাল্টে এগিয়ে ছিল আফডি। তবে জার্মানির রাজ্য নির্বাচনে কোনো দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া খুবই বিরল। ফলে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও দলটির এককভাবে সরকার গঠনের লক্ষ্য পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।
ফল ঘোষণার পর উচ্ছ্বসিত আফডির প্রধান প্রার্থী উলরিখ জিগমুন্ড সিএনএনকে বলেন, ‘এটি আমাদের সুন্দর অঞ্চলের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মানুষ খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে তারা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন চায়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা আমাদের সঙ্গে এই পরিবর্তন চায়।’
নির্বাচনী প্রচারে আফডি ‘রিমিগ্রেশন’ বা বিদেশি ও অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নীতিকে গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে দলটি প্রকাশ্যেই রাশিয়াপন্থী অবস্থান নিয়েছে। স্কুল ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও ঐতিহ্যনির্ভর মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সম্প্রচারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনাও তুলে ধরেছে দলটি।
রাজ্যের রাজধানী ম্যাগডেবার্গে নির্বাচনী অনুষ্ঠানস্থল থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জিগমুন্ড বলেন, এই ফলাফল রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশের সঙ্গেই ‘বুদ্ধিমান কূটনীতি’তে ফেরার জন্য আফডিকে জনসমর্থনের ভিত্তি দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দেশ হিসেবে সফল হতে চাইলে আমাদের দুজনকেই প্রয়োজন।’
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই আফডির সহ-সভাপতি অ্যালিস ভেইডেলও সিএনএনকে বলেন, ‘জার্মানরা এমন নীতিতে বিরক্ত, যা জার্মানির স্বার্থের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে। আমরা খুব স্পষ্টভাবেই দেশের স্বার্থ তুলে ধরতে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি—ইউক্রেনের স্বার্থে নয়, অন্য কোনো দেশের স্বার্থেও নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে আফডির প্রতি সমর্থন দেখিয়ে আসছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে নির্বাচনের এক্সিট পোলের একটি ছবি পোস্ট করেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন কিরিল দিমিত্রিয়েভ ট্রাম্পের ওই পোস্ট নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে পুনরায় পোস্ট করেন। একই সঙ্গে তিনি আফডির ‘ঐতিহাসিক জয়’ নিয়ে আরেকটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বলেন, এই জয় ‘জার্মানির অযোগ্য, যুদ্ধকামী ও ভণ্ড শাসক জোটের অহংকার, সংকীর্ণ মানসিকতা ও অযোগ্যতাকে অপমানিত করেছে।’
এখন জোট গঠন নিয়ে প্রশ্ন
এখন আফডির সামনে মূল প্রশ্ন হলো—দলটি কি কোনো জোট করে সরকার গঠন করবে, নাকি এককভাবে সংখ্যালঘু সরকার পরিচালনার চেষ্টা করবে।
জার্মানির মূলধারার সব রাজনৈতিক দলই আফডির সঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। মুসলিম ও অভিবাসীবিরোধী বক্তব্যের কারণে জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা দলটিকে উগ্রপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মূলধারার দলগুলো তাই আফডির সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সহযোগিতা না করার নীতি বজায় রেখেছে। জার্মান রাজনীতিতে এই নীতি ‘ফায়ারওয়াল’ নামে পরিচিত।
আফডির সহ-সভাপতি ভেইডেল এই অবস্থানের সমালোচনা করে একে ‘গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক’ বলে অভিহিত করেছেন।
অন্য দলগুলো একজোট হলেও সংখ্যার হিসাবে আফডি এতটাই এগিয়ে যে তাদের ছাড়া অন্য দলগুলোর বড় জোটও সহজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে আফডির ভেতরেও জোট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
জার্মানির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম জেডডিএফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জিগমুন্ড বামপন্থী বিএসডব্লিউর সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একেবারে পরিষ্কার করে দিতে চাই, নির্বাচনের পর ভোটাররা যেন শেষ পর্যন্ত তাদের ভোটের ফল পান।’ তিনি বিএসডব্লিউকে ‘সমস্যার অংশ, সমাধান নয়’ বলেও মন্তব্য করেন।
তবে আফডির সহ-সভাপতি টিনা ক্রুপাল্লা বলেন, তারা সব দলের দিকে ‘সহযোগিতার হাত বাড়াতে’ প্রস্তুত।
চাপে জার্মানির চ্যান্সেলর
এই নির্বাচনের ফল জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্যাক্সনি-আনহাল্টে আফডির বড় জয় মেরৎসের রক্ষণশীল দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)কে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে সিডিইউ যেখানে প্রায় ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, এবার তা নেমে এসেছে প্রায় ১৮ শতাংশে।
দেশজুড়েই মেরৎস সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার মধ্যে স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল তার নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। জার্মানির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এআরডি বলেছে, ‘আসল প্রশ্ন হলো, তিনি আর কত দিন টিকে থাকবেন।’
স্যাক্সনি-আনহাল্টে মেরৎসের দল সিডিইউ তাদের ভোটের বড় একটি অংশ হারিয়েছে। রাজ্যের বর্তমান মন্ত্রী ও সিডিইউর শীর্ষ প্রার্থী সভেন শুলৎসে বলেন, ‘এই ফলাফল আমাদের অনেক কিছু বলছে… মানুষ একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে… এবং এই বার্তাকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।’
অন্যদিকে, আফডির সহ-সভাপতি ভেইডেল এই সুযোগে সিডিইউ ও চ্যান্সেলর মেরৎসের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, মেরৎসকে সরিয়ে দেওয়া হবে এবং ‘বড়দিনের আগেই’ নতুন করে কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
আফডির এই জয়কে শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচনী ফল হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। জার্মানির কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। একটি জরিপে স্যাক্সনি-আনহাল্টের ৮৭ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
রাশিয়ার প্রতি আফডির সমর্থন
আফডির রাশিয়াপন্থী অবস্থানও নতুন কিছু নয়। দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা নিয়মিত মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়া উপদ্বীপে সফর করেছেন। ইউক্রেনকে আরও সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছে আফডি। দলটি রাশিয়ার সঙ্গে জার্মানির সম্পর্ক পুনরায় ঘনিষ্ঠ করার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে।
দলটির নেতারা প্রায়ই কিয়েভকে দেওয়া প্রতিরক্ষা সহায়তাকে এমন অর্থ হিসেবে তুলে ধরেন, যা জার্মান জনগণের জন্য ব্যয় করা উচিত ছিল। অভিবাসন নীতির আলোচনায় ইউক্রেনীয় ও মুসলিম বাসিন্দাদেরও জার্মানি থেকে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন দলটির নেতারা।
তবে পররাষ্ট্রনীতি ও অভিবাসনসংক্রান্ত অনেক বিষয় রাজ্য সরকারের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের ইউরোপ ও রাশিয়া-ইউরেশিয়া কর্মসূচির পরিচালক গ্রেগোয়ার রুস মনে করেন, স্যাক্সনি-আনহাল্টে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে আফডি সংস্কৃতি, শিক্ষা ও স্থানীয় পুলিশের মতো বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দেবে। জার্মানির রাজ্য সরকারগুলোর শিক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সংস্কৃতির মতো বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে।
রোববারের ঐতিহাসিক সাফল্যের পর কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পেলে আফডি কী করতে চায়, তারও ইঙ্গিত দিয়েছেন ভেইডেল।
তিনি বলেন, ‘আমরা সব অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাব, আমাদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করব এবং যাদের দেশ ছাড়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাদের সবাইকে ফেরত পাঠাব।’
স্যাক্সনি-আনহাল্টের এই ফল জার্মানির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো কোনো উগ্র ডানপন্থী দল একটি জার্মান রাজ্যের ক্ষমতার এতটা কাছে পৌঁছেছে। তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এখন আফডি সরকার গঠন করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে অন্য দলগুলোর অবস্থান এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।