০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৩

‘চোরেদের গ্রাম’ থেকে উঠে এসে মেডিকেলে চান্স পেলেন প্রতিবন্ধী কালিমুল্লা

কালিমুল্লা ও তার মা-বাবা   © সংগৃহীত

একসময় যে গ্রামের পরিচিতি ছিল ‘মিনি চম্বল’ কিংবা ‘চোরেদের গ্রাম’ হিসেবে, সেই পুনিশোল থেকেই এবার চিকিৎসক হওয়ার পথে পা রাখলেন কালিমুল্লা মণ্ডল। ৬০ শতাংশ প্রতিবন্ধকতা নিয়েও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে জাতীয় স্তরের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা NEET-এ সাফল্য পেয়েছেন তিনি। অল ইন্ডিয়া র‍্যাঙ্ক ৫৮ হাজার ৪০০ এবং স্টেট র‍্যাঙ্ক প্রায় ৮ হাজার নিয়ে ইতোমধ্যে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছেন কালিমুল্লা। পুনিশোল গ্রামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি এমবিবিএস পড়তে যাচ্ছেন।

বাঁকুড়া জেলার ওন্দা ব্লকের গ্রাম পুনিশোল। প্রায় ৭০ হাজার মানুষের বসবাস এই গ্রামে। বাঁকুড়ার অন্যতম বড় গ্রাম হলেও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে ছিল পুনিশোল। গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ হকারি পেশার সঙ্গে যুক্ত। অনেকে কৃষিকাজও করেন। শিক্ষার সুযোগ ও পরিকাঠামোর অভাবে বহু মানুষ উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত যেতে পারেননি।

এই কারণেই একসময় পুনিশোলের সঙ্গে ‘মিনি চম্বল’ বা ‘চোরেদের গ্রাম’ তকমা জুড়ে গিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই কালিমুল্লাকেও শুনতে হয়েছে, ‘পুনিশোলে পড়াশোনার বালাই নেই। এদের আচরণ খারাপ।’ তবে সেই ধারণাকেই নিজের সাফল্য দিয়ে ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি।

নিজের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত কালিমুল্লা বলেন, ‘আমার খুবই ভালো লাগছে যে আমি পুনিশোলের মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছি। সৎভাবে পরিশ্রম করলে প্রত্যেকে একদিন না একদিন লক্ষ্যে পৌঁছবেই।’

কালিমুল্লার বাবা বুয়ালী কলন্দর মণ্ডল একজন প্রাক্তন সরকারি কর্মী। নয় ভাই-বোনের মধ্যে কালিমুল্লা সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর ছিল অদম্য আগ্রহ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর পথের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। পায়ের সমস্যাকে সঙ্গী করেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি।

২০২৩ সালে পুনিশোল বোর্ড হাইস্কুল থেকে ৬৪৬ নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পাস করেন কালিমুল্লা। পরে বাঁকুড়া বঙ্গ বিদ্যালয় থেকে ৪৪০ নম্বর পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে NEET-এর প্রস্তুতি শুরু করেন।

প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট কোনো কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করেননি কালিমুল্লা। অনলাইনে বিভিন্ন ক্লাস করেছেন, সেখান থেকে নিজের মতো করে নোট তৈরি করেছেন। পাশাপাশি NCERT-এর স্টাডি ম্যাটেরিয়াল পড়েছেন এবং নিয়মিত MCQ অনুশীলন করেছেন। নিজের প্রস্তুতি যাচাই করতে বিভিন্ন পরীক্ষাতেও অংশ নিতেন।

এবার NEET-এ সাফল্য পাওয়ার পর বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পেয়েছেন কালিমুল্লা। ভবিষ্যতে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে রোগী দেখার স্বপ্ন তাঁর। তবে শুধু চিকিৎসক হওয়াই নয়, সার্জারিতে বিশেষায়িত হওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর।

কালিমুল্লার এই সাফল্যে খুশি পুরো পুনিশোল। স্থানীয় বাসিন্দা আবুবক্কর খান বলেন, শিক্ষার সুযোগের অভাবেই একসময় পুনিশোলের সঙ্গে ‘মিনি চম্বল’ বা ‘ডাকাতদের গ্রাম’ নামটি জড়িয়ে গিয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে গ্রামের শিক্ষার হার বেড়েছে। কালিমুল্লার সাফল্য নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের আরও উৎসাহিত করবে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, কালিমুল্লাকে দেখে পুনিশোলের তরুণ প্রজন্ম পড়াশোনার প্রতি আরও আগ্রহী হবে। গ্রামের অতীতের নেতিবাচক পরিচয় পেছনে ফেলে ছেলে-মেয়েরা ভবিষ্যতে আরও দূর এগিয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

ছেলের সাফল্যে গর্বিত বাবা বুয়ালী কলন্দর মণ্ডলও। তাঁর মতে, পুনিশোলকে যেভাবে নেতিবাচকভাবে দেখা হতো, সেটি অনেকটাই অতিরঞ্জিত। গ্রামের মানুষের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই; কয়েকজনের কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো গ্রামের ওপর একটি নেতিবাচক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি স্বীকার করেন, গ্রামে শিক্ষার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো এখনো নেই। এই ঘাটতির কারণে অনেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন না।

ছেলে চিকিৎসক হয়ে গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়াক—এটাই বাবার প্রত্যাশা। কালিমুল্লার সাফল্য সেই স্বপ্ন পূরণের পথ আরও এগিয়ে দিয়েছে।

পুনিশোল বোর্ড হাইস্কুলের সহশিক্ষক বিবেকরঞ্জন মাজি বলেন, ‘পুনিশোল গ্রামে একটা নতুন ইতিহাস রচনা হলো। কারণ, যে পুনিশোলকে আমরা অন্য ভাবে চিনি। সেই অন্ধকার থেকে আলোর উত্তরণে আরও একটা ধাপ এগিয়ে গেল এই গ্রাম।’

কালিমুল্লার সাফল্য তাই শুধু একটি মেডিকেল কলেজে ভর্তির গল্প নয়; দীর্ঘদিনের নেতিবাচক পরিচয়ের বাইরে এসে একটি গ্রামের নতুন করে স্বপ্ন দেখার গল্পও। তাঁর এই অর্জন এখন পুনিশোলের অসংখ্য ছেলে-মেয়ের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।