রানওয়ে থেকে ছিটকে গেল বিমান, নিহত ৫
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে অ্যামাজনের একটি কার্গো বিমান কয়েকটি গাড়িতে আঘাত করেছে। এতে বিমানটিতে আগুন ধরে যায় এবং দুর্ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পুয়ের্তো রিকো থেকে আসা বিমানটি অবতরণের সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
বিমানটি রানওয়ে অতিক্রম করে কয়েকটি গাড়িতে আঘাত করার পরপরই এতে আগুন ধরে যায়। আকাশে ছড়িয়ে পড়ে ঘন কালো ধোঁয়া। দুর্ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়েগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে বিমানবন্দরটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
মায়ামি-ডেড ফায়ার রেসকিউ বিভাগের প্রধান রে জাদাল্লাহ জানান, দুর্ঘটনার পর বিমানের ককপিটে পাইলট ও কো-পাইলট আটকা পড়েন। বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে গিয়ে একাধিক গাড়িতে আঘাত করায় কয়েকজন মানুষও তাদের গাড়ির ভেতরে আটকা পড়েন।
রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে মায়ামি-ডেড কাউন্টির মেয়র ড্যানিয়েলা লেভিন কাভা জানান, দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন এবং আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। মায়ামি-ডেড ফায়ার রেসকিউ জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় মোট ১০ জন হতাহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছেন, তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং দুজনকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
তিনি দুর্ঘটনাটিকে ‘খুবই জটিল পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি আরও জানান, রানওয়ে থেকে ছিটকে যাওয়ার পর বিমানটি একাধিক গাড়িতে আঘাত করে। এতে কয়েকজন মানুষ গাড়ির ভেতরে আটকা পড়েন।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি) একটি তদন্ত দল গঠন করেছে। সংস্থাটি রোববার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানায়। তদন্ত নিয়ে সোমবার গণমাধ্যমকে ব্রিফ করার কথা রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওগুলোতে অ্যামাজনের তীরচিহ্নের লোগোযুক্ত বিমানটির চারপাশ থেকে ঘন ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। দুর্ঘটনার পরপরই হতাহত নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অসমর্থিত তথ্য ছড়িয়ে পড়লেও শুরুতে প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা যায়নি।
দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটি ছিল বোয়িং ৭৬৭-৩০০ মডেলের কার্গো বিমান। এটি অ্যামাজন প্রাইম এয়ারের হয়ে পণ্য পরিবহন করছিল এবং ২১ এয়ার বিমানটি পরিচালনা করছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) এক বিবৃতিতে দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ‘২১ এয়ারের ফ্লাইট ৭৫৯৮ রোববার ৬ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় দুপুর ২টার দিকে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর রানওয়ে অতিক্রম করে। বোয়িং ৭৬৭-৩০০ কার্গো বিমানটি পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ান থেকে লুইস মুনোজ মারিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে এসেছিল। এফএএ দুর্ঘটনাটি তদন্ত করবে।’
মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এক মুখপাত্র জানান, বিমানটি বিমানবন্দরের তির্যক রানওয়ে অতিক্রম করে উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে গিয়ে অচল হয়ে পড়ে।
দুর্ঘটনার পর বিমানবন্দরে আকাশ ও স্থলপথে সব ধরনের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে অন্য কোনো বিমান মায়ামি বিমানবন্দরে অবতরণ কিংবা সেখান থেকে উড্ডয়ন করতে পারেনি। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও বিমানটির জ্বালানি লিক সামাল দিতে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা কাজ করছিলেন বলে জানান রে জাদাল্লাহ।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘বিকেল ৩টা থেকে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ে বন্ধ রয়েছে এবং বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড স্টপ কার্যকর আছে।’ তারা আরও জানায়, ‘মায়ামি-ডেড ফায়ার রেসকিউ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে।’
বিমান চলাচলে বিঘ্নের তথ্য পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেলের দিকে মায়ামি বিমানবন্দরে প্রায় ২৫০টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। দুর্ঘটনার কারণে আরও ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মায়ামি-ডেড ফায়ার রেসকিউ বিভাগের ৬০টিরও বেশি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ফায়ার সার্ভিস জানায়, তাদের সদস্যরা সেখানে গিয়ে আগুনে জ্বলতে থাকা বিমান দেখতে পান। দুর্ঘটনার কারণে বিমানটিতে প্রচণ্ড আগুন জ্বলছিল এবং চারপাশে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। বিমানটি বিমানবন্দরের কাছে একাধিক গাড়িতে আঘাত করেছিল বলেও জানায় তারা।
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা একদিকে আগুন নেভানোর কাজ করেন, অন্যদিকে ঘটনাস্থলে থাকা আহতদের অবস্থা মূল্যায়ন করেন এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার তৎপরতা চালান।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, উদ্ধারকর্মীরা ‘অ্যামাজনের একটি কার্গো বিমান রানওয়ে অতিক্রম করার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবেন’।
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যদি এই এলাকার মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করেন, তাহলে বড় ধরনের বিলম্ব এবং সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিলের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’
এদিকে দুর্ঘটনার কারণে আশপাশের সড়কেও বিধিনিষেধ আরোপ করে মায়ামি-ডেড শেরিফের কার্যালয়। তারা জানায়, ‘এনডব্লিউ ২৫তম স্ট্রিট থেকে এনডব্লিউ ৩৬তম স্ট্রিট পর্যন্ত এনডব্লিউ ৬৭তম অ্যাভিনিউ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। বিলম্বের আশঙ্কা রয়েছে এবং বিকল্প সড়ক ব্যবহার করুন।’
অ্যামাজনের মুখপাত্র কেলি ন্যান্টেল দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে, অ্যামাজন এয়ারের একটি বিমান আজ মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। বিমানটি ২১ এয়ার পরিচালনা করছিল।’
অ্যামাজন জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তারা সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
এক বিবৃতিতে অ্যামাজন আরও বলেছে, ‘মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আজকের ঘটনায় পাঁচজনের প্রাণহানির খবর জেনে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতদের পরিবার, স্বজন এবং ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা।’