০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৩৭

গাজা অবরোধ ভাঙতে ফের সমুদ্রে ভাসছে ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’

ফ্রিডম ফ্লোটিলা   © টিডিসি ছবি

ইসরায়েলের অবরোধ উপেক্ষা করে সমুদ্রপথে গাজায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে আবারও যাত্রা শুরু করেছে ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’। অক্টোবর মাসে গাজায় পৌঁছানোর পরিকল্পনা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে অবস্থান করছে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের (এফএফসি) কয়েকটি জাহাজ। আগের অভিযানে স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও আটকের অভিযোগ থাকলেও এবারও গাজায় পৌঁছানোর লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি সংগঠনটি।

ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন জানিয়েছে, আগের কয়েকটি অভিযানে তাদের স্বেচ্ছাসেবীরা গুরুতর মারধর, বারবার টেজার দিয়ে বৈদ্যুতিক শক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার পরও নতুন করে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

কোয়ালিশনটি আরও অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল গাজায় খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। তাদের দাবি, গাজার মানবিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

এফএফসির স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য জোহার চেম্বারলেন রেভেগ বলেন, ‘আমাদের সরকারগুলো তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে চলেছে বলেই ফ্রিডম ফ্লোটিলা আবারও যাত্রা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি বন্দরে আমরা এই দাবি তুলে ধরব যে ফিলিস্তিনিদের সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা দিতে হবে। অক্টোবরে আমরা এই দাবি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সংহতি গাজার উপকূলে পৌঁছে দিতে চাই।’

এফএফসি জানিয়েছে, এরই মধ্যে দুটি জাহাজ ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরের মধ্যে যাতায়াত করেছে। এর মধ্যে ‘হানদালা-২’ জুন ও জুলাই মাসে নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক সফর করেছে।

যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল থেকে চলতি মাসের শুরুতে ‘কেট’ নামের আরেকটি জাহাজ যাত্রা করে। পরে জাহাজটি আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্সে অবস্থান করে বলে জানিয়েছে কোয়ালিশনটি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্লোটিলাটি স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালিতে যাবে। এরপর সেখান থেকে গাজার উদ্দেশে যাত্রা করবে।

এফএফসি জানিয়েছে, এই অভিযানে মানবাধিকারকর্মী, ট্রেড ইউনিয়নকর্মী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, চিকিৎসাকর্মী এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থনকারী বিভিন্ন ব্যক্তি অংশ নিচ্ছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি বন্দরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জনসমাবেশ ও বৈঠকের আয়োজন করা হবে।

এফএফসি বিভিন্ন সরকারকে ইসরায়েলে অস্ত্র ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বন্ধ এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও দাবি জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজগুলোকে নিরাপদে গাজায় পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কোয়ালিশনটি আরও বলেছে, সরকারগুলোর উচিত ফ্লোটিলার জন্য নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করা। তাদের দাবি, ফ্লোটিলার কোনো জাহাজে হামলা, জাহাজ দখল, গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করা বা বেআইনিভাবে আটক করার চেষ্টা করা হলে এর কূটনৈতিক পরিণতি হবে—এ বিষয়টি সরকারগুলোকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে।

এফএফসি গাজায় অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং খাদ্য, পানি, ওষুধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য প্রবেশে ইসরায়েলের অবরোধ বন্ধ করারও দাবি জানিয়েছে।

এই অভিযানে অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের প্রকৌশলী এডওয়ার্ড ডিগিলিও বলেন, ‘আমরা জানি, গাজার দিকে জাহাজ চালিয়ে যাওয়া গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু নীরব থাকা এবং কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার মূল্য ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং বিশ্বের জন্য আরও অনেক বেশি। এই অভিযান আমাদের অভিন্ন মানবিকতার প্রকাশ এবং একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতির প্রতীক।’

এর আগে গাজায় সমুদ্রপথে পৌঁছানোর চেষ্টা করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীদের বিভিন্ন উদ্যোগ ইসরায়েলি বাহিনী আটকে দিয়েছে।

২০০৮ সালে গাজায় জাহাজ পাঠানো ফ্রি গাজা মুভমেন্টের ধারাবাহিকতায় ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন গড়ে ওঠে।

২০১০ সালে ইসরায়েলি বাহিনী ‘মাভি মারমারা’ জাহাজে অভিযান চালায়। ওই ঘটনায় জাহাজটিতে থাকা ১০ জন কর্মী নিহত হন।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযানে আটক হওয়ার পর ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে অপহরণ, নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগও তুলেছেন ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া কর্মীরা।

এপ্রিল মাসে অবরুদ্ধ গাজার উদ্দেশে যাত্রা করা ত্রাণবাহী কয়েকটি জাহাজে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অভিযান চালায় ইসরায়েলি নৌবাহিনী। ওই জাহাজগুলো গাজা উপকূল থেকে শত শত নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল।

২০২৫ সালে ইসরায়েলের যুদ্ধ ও গাজায় ত্রাণ অবরোধের প্রতিক্রিয়ায় যাত্রা শুরু করা ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ ত্রাণ অভিযানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অন্তত ১৫টি নৌযানে অভিযান চালানো হয়। এসব নৌযানে থাকা ব্যক্তিদের ইসরায়েলি বাহিনী ‘অপহরণ’ করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা আরও জানিয়েছে, অভিযানের পর বিভিন্ন জাহাজকে ‘পরিকল্পিতভাবে অচল’ করে দেওয়া হয়। এতে সেগুলোতে থাকা কর্মীরা সমুদ্রে আটকা পড়েন।

জুন মাসে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক মিডল ইস্ট আইকে জানান, ইসরায়েলি বাহিনী তাঁদের জাহাজ আটকে দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাঁদের আটক করে। এ সময় তাঁদের মারধর, যৌন হয়রানি, টেজার দিয়ে বৈদ্যুতিক শকসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।

ওই কর্মীরা আরও জানান, ইসরায়েলি বাহিনী তাঁদের ‘কারাগারের জাহাজ’ হিসেবে বর্ণনা করা নৌযানে করে ইসরায়েলে নিয়ে যায়। আটক থাকা অবস্থায় তাঁদের যথাযথ সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্য সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও অঞ্চলটির মানবিক পরিস্থিতি সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও গাজাবাসী এখনো কঠিন মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন।

এফএফসি জানিয়েছে, অক্টোবরে তাদের সমুদ্রযাত্রার মূল লক্ষ্য হলো গাজায় অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা এবং ইসরায়েলের অবরোধের অবসান ঘটানো।

পুরো যাত্রাপথে আয়োজকেরা সরকারগুলোর প্রতি নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাবেন। একই সঙ্গে ফ্লোটিলার জাহাজগুলো আটক বা গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানাবেন তারা।