গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ পরিকল্পনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘না’
গাজা থেকে লাখো ফিলিস্তিনিকে উচ্ছেদের ইসরায়েলি পরিকল্পনায় সরাসরি আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ওয়াশিংটনের এমন অবস্থান দুই দেশের মধ্যে বিরল প্রকাশ্য মতবিরোধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গাজার মানুষকে জোর করে বাস্তুচ্যুত করা, বহিষ্কার বা অন্য কোথাও সরিয়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না বলে স্পষ্ট করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সম্প্রতি গাজার জনসংখ্যা সরিয়ে দেওয়াকে সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর এমন বক্তব্যের পরই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে।
শুক্রবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’র ১২ নম্বর দফায় বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘কাউকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। যারা চলে যেতে চান, তারা স্বাধীনভাবে যেতে পারবেন এবং ফিরে আসতেও পারবেন। আমরা মানুষকে গাজায় থেকে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করব এবং তাদের আরও উন্নত গাজা গড়ে তোলার সুযোগ দেব।’
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই মুখপাত্র আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র গাজার জনগণকে জোর করে বাস্তুচ্যুত করা, বহিষ্কার করা বা বাধ্যতামূলকভাবে অন্যত্র স্থানান্তরের কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তাব সমর্থন করে না।’
এর আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ দাবি করেছিলেন, ট্রাম্প গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার সমর্থন বাতিল করেননি, শুধু ‘স্থগিত’ রেখেছেন। মানবাধিকারকর্মীরা এ ধরনের পরিকল্পনাকে জাতিগত নিধনের শামিল বলে মনে করেন।
বুধবার কাটজ বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এই অভিবাসন ছাড়া গাজার জন্য কোনো বাস্তব সমাধান নেই।’
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা গাজার জনসংখ্যা সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাকে বোঝাতে ‘অভিবাসন’ শব্দটি ব্যবহার করছেন।
কাটজ বলেন, ইসরায়েল সরকার ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে ‘সমুদ্রপথে, আকাশপথে এবং এটি করার জন্য যেকোনো উপায়ে’ বের করে দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো ‘সব সময় আলোচনা করা হচ্ছে’।
এর পরদিন ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও একই ধরনের বক্তব্য দেন।
বেন-গভির বলেন, ‘এখন শান্তির কল্পনার বদলে আমাদের অভিবাসনের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। ফিলিস্তিনিদের সুড়ঙ্গ খোঁড়ার বদলে এখন সময় এসেছে স্যুটকেস গোছানোর।’
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি আরব দেশসহ আরব রাষ্ট্রগুলোও ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে আল জাজিরাকে ট্রাম্পের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের দিকে নির্দেশ করেছে। গত আগস্টে ওই পোস্টে ট্রাম্প হামাসকে নিরস্ত্র করার একটি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
ওই চুক্তির আওতায় ইসরায়েল ধীরে ধীরে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে এবং ভূখণ্ডটিতে প্রায় প্রতিদিন চলা প্রাণঘাতী হামলা বন্ধ হবে।
তবে ইসরায়েল ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির দাবি, গাজা পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো ছাড় দেবে না।
এর আগে ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রথমবার গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রায় ২০ লাখ মানুষের বসবাসের এই ভূখণ্ডকে তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা’তে পরিণত করার কথা বলেছিলেন।
পরে ২০২৫ সালেই ট্রাম্প গাজা সংকটের অবসানে ২০ দফা পরিকল্পনা সামনে আনেন। তখন মনে হয়েছিল, তিনি আগের প্রস্তাব থেকে সরে এসেছেন।
গত বছরের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েল ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়। তবে এরপরও ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
গত মাসে সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার হামাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। একই সময়ে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও বৈঠক করেন।
তবে কুশনারের বক্তব্যে ইসরায়েল সরকারের অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি বলেন, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজায় কোনো পুনর্গঠন হবে না। গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ‘আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অধিকার সীমিত করবে না’ বলেও তিনি জোর দেন।
হামাস অস্ত্র ছেড়ে দিতে রাজি হলেও ট্রাম্পের ‘যুদ্ধবিরতি’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি হয়নি।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে অনড় থাকায় চলমান আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আল জাজিরাকে বলেছে, ‘যেকোনো স্থানান্তর অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক হতে হবে এবং আমাদের মূল লক্ষ্য গাজার বাসিন্দাদের স্বার্থে গাজাকে নিরস্ত্রীকরণ, স্থিতিশীল করা এবং পুনর্গঠন করা।’
দপ্তরটি আরও বলেছে, ‘এ ছাড়া ২০ নম্বর দফায় যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে একটি সংলাপ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যাতে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সহাবস্থানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা একমত হতে পারে।’
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব সেন্টারের প্যালেস্টাইন/ইসরায়েল কর্মসূচির প্রধান ইউসুফ মুনাইয়্যার বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার কারণ হলো ইসরায়েলিরা ‘এই ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সহাবস্থান সম্ভব নয়’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুধু গাজাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি পশ্চিম তীর এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হতে পারে।
মুনাইয়্যার আল জাজিরাকে বলেন, ‘তারা কোনো ধরনের ফিলিস্তিনির সঙ্গেই বসবাস করতে চায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা যে মৌলিক সমস্যাটি তৈরি করেছে, তা কোনোভাবেই সমাধান করতে পারছে না। সেই সমস্যা হলো—একটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর নিজেদের চাপিয়ে দিয়ে তারা পুরো জনগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করেছে। এই জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করা ছাড়া অন্য কোনো সমাধান তারা ভাবতেই পারছে না।’