চীনা যুদ্ধবিমান ও মক্কা চুক্তিতে আগ্রহ, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে কী বার্তা দিতে চাইছে বাংলাদেশ?
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পরে পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবছে বাংলাদেশ। ছাত্র-জনতার হাতে তল্পিতল্পাসহ আওয়ামী লীগ সরকার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তাদের মেয়াদেই চীনা সামরিক প্রযুক্তির আধুনিক সংস্করণ জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ঢাকা। পরবর্তীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতা নেওয়ার ছয় মাসের মাথায় যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সেই চুক্তিতে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছে। পরবর্তীতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র প্রতি ঢাকার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করেছে সরকার—এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ তার সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’—এই জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে অনড় থাকলেও এই নতুন উদ্যোগগুলো ঢাকার কৌশলগত চিন্তাভাবনার এক ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দুটি বিষয়ই কোনো চূড়ান্ত বা বাধ্যবাধকতামূলক সামরিক চুক্তি নয়, বরং আগ্রহের প্রাথমিক প্রকাশ।
তা সত্ত্বেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিদ্যমান টানাপোড়েনের মাঝে এই পদক্ষেপগুলো বেইজিংয়ের সাথে সামরিক সম্পর্ক জোরদার, পাকিস্তানের সাথে সামরিক সম্পর্কের বরফ গলানো এবং ভারতীয় উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে এক বিস্তৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে ঢাকার নজর দেওয়ার প্রবণতাকে নির্দেশ করে। এর পাশাপাশি গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত হওয়ার বিষয়টিও আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।
চীনের যুদ্ধবিমান ক্রয়ে প্রস্তাবিত এই চুক্তির আওতায় চীন থেকে প্রায় ২.২ থেকে ২.২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান, অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের আলোচনা চলছে। ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান ইউরোফাইটার টাইফুনের তুলনায় এটি বেশ সাশ্রয়ী। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের তৈরি এই জে-১০সিই বিমানের বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ঢাকার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগের নতুন পথ উন্মুক্ত হচ্ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতিও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে ঢাকা। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে ‘একজনের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ’ নীতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ এতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ দেখালেও এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন কোনো নিরাপত্তার হুমকি বা শত্রুপক্ষ নেই (যেমন সৌদি আরবের জন্য ইরান/ইয়েমেন, তুরস্কের জন্য ইসরায়েল/সিরিয়া এবং পাকিস্তানের জন্য ভারত ও অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাবাদ)।
বাংলাদেশের মূল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ যেখানে ভারতের সাথে সীমান্ত বিরোধ এবং মিয়ানমার কেন্দ্রিক অস্থিরতা, সেখানে সরাসরি এই জোটে যুক্ত হওয়া ঢাকার জন্য বহুমুখী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, নয়া দিল্লিকে বাংলাদেশের এই বার্তাগুলোকে পুরোপুরি ‘ভারত-বিরোধী’ অবস্থান হিসেবে না দেখে পরিস্থিতির আলোকে বিবেচনা করা উচিত। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামী শেখ হাসিনাকে ফেরত ও ওসমান হাদীর হত্যাকারীকে ফেরত দেওয়া নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শীতল হওয়া নিয়ে এমনিতেও দুই দেশের মধ্যে অস্বস্তির কারণ আছে। তবে প্রবাসী আয়ের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা, ভারতের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, জ্বালানি পরিবহন পথ এবং বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তাজনিত স্বার্থের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোনো সরাসরি সামরিক জোটে জড়াবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, বিশ্বস্ত সামরিক জোটে আবদ্ধ না হয়ে বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।