০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪০

ব্যর্থতার পর ‘দুষ্টু ছেলে’র বাজিমাত, মহাকাশে বড় সাফল্য ভারতের

ভারতের ‘দুষ্টু ছেলে’ রকেট   © টিডিসি ছবি

একসময় ব্যর্থতার কারণে যে রকেটকে ইসরোর বিজ্ঞানীরা মজা করে ‘দুষ্টু ছেলে’ বলে ডাকতেন, সেই GSLV-F17-ই এবার ভারতের মহাকাশ অভিযানে বড় সাফল্য এনে দিয়েছে। পিএসএলভির পরপর ব্যর্থতায় যখন ভারতের মহাকাশযান উৎক্ষেপণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল, ঠিক তখনই আজ  (৪ সেপ্টেম্বর) ভোরে সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়েছে ইসরো।

রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ভারতের অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমে, তখন অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায় শুরু হয় ব্যস্ততা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা মিশন কন্ট্রোল রুম, উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও ট্র্যাকিং স্টেশনে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ইসরো) বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও সহায়ক কর্মী উৎক্ষেপণ সফল করার জন্য কাজ করছিলেন। মাত্র ১৯ মিনিট পর, ভোর ৩টা ১৪ মিনিটে GSLV-F17 সফলভাবে EOS-05 পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহকে মহাকাশে পাঠায়। এরপর ইসরোর নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রে নেমে আসে স্বস্তি ও আনন্দ।

বিজ্ঞানমন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিং এই সাফল্যকে ভারতের মহাকাশ গবেষণায় বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভারতের মহাকাশ অভিযানে আরেকটি বিশাল অগ্রগতি! GSLV-F17/EOS-05 সফলভাবে উৎক্ষেপণের জন্য ইসরোর পুরো দলকে অভিনন্দন। EOS-05 একটি অত্যাধুনিক পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ। এটি ভূ-সমলয় কক্ষপথ থেকে ভারতের প্রথম ইমেজিং স্যাটেলাইট, যা দৃশ্যমান, ইনফ্রারেড, মাল্টি-স্পেকট্রাল ও হাইপার-স্পেকট্রাল ব্যান্ডে উন্নতমানের ছবি তুলতে সক্ষম।’

দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য রকেট পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল বা পিএসএলভি পরপর দুটি উৎক্ষেপণে ব্যর্থ হওয়ার পর ইসরোর জন্য GSLV-F17-এর এই সাফল্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পিএসএলভির ব্যর্থতার পর ইসরোকে দীর্ঘ তদন্ত ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রকৌশলীরা এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের কাজ করছেন। এসব কাজ শেষ করে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত পিএসএলভির বহর মাটিতেই থাকবে।

রকেট প্রযুক্তি অত্যন্ত জটিল। ছোটখাটো ত্রুটিও একটি পুরো মিশন ব্যর্থ করে দিতে পারে। এ কারণেই নিয়মিত রকেট উৎক্ষেপণ করে এমন দেশের সংখ্যা বিশ্বে খুব বেশি নয়। শ্রীহরিকোটা থেকে এটি ছিল বড় ধরনের রকেট উৎক্ষেপণের ১০৭তম অভিযান।

এমন পরিস্থিতিতে ইসরোর GSLV Mk II-এর ওপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে। এই রকেটকে ইসরোর বিজ্ঞানীরা ‘নটি বয়’ বা ‘দুষ্টু ছেলে’ বলে ডাকেন। কারণ, ১৯টি উৎক্ষেপণের মধ্যে এই রকেট ছয়বার ব্যর্থ হয়েছে। তবে ব্যর্থতার সেই ইতিহাস পেরিয়ে একই রকেট এখন ভারতের প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে।

GSLV Mk II-এর গল্পের শুরু ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায়। ভারী যোগাযোগ উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাতে তখন ভারতের প্রয়োজন ছিল ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে অত্যন্ত ঠান্ডা অবস্থায় রাখা তরল হাইড্রোজেন ও তরল অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়। রকেট প্রযুক্তির সবচেয়ে জটিল প্রপালশন ব্যবস্থাগুলোর একটি এটি।

ভারত প্রথমে রাশিয়ার কাছ থেকে এই প্রযুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ভূরাজনৈতিক চাপ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞার কারণে বিষয়টি জটিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত রাশিয়া ভারতকে সীমিতসংখ্যক ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন সরবরাহ করলেও পুরো প্রযুক্তি দেয়নি।

এই পরিস্থিতি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ পরিকল্পনাকে থামিয়ে দিতে পারত। কিন্তু ভারত পিছিয়ে যায়নি। বরং সংকটকে কাজে লাগিয়ে ইসরোর বিজ্ঞানীরা নিজস্ব ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ শুরু করেন। প্রায় ২০ বছর ধরে তারা এই কঠিন প্রযুক্তি আয়ত্ত করার চেষ্টা করেন। পথে এসেছে অসংখ্য ব্যর্থতা, বিলম্ব ও হতাশা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা কাজ চালিয়ে গেছেন।

এই অধ্যবসায়ের ফলেই GSLV Mk II ইসরোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অর্জনে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি সফল উৎক্ষেপণ প্রমাণ করছে, প্রযুক্তি হস্তান্তরে বাধা দিয়েও ভারতের মহাকাশযাত্রা থামানো যায়নি।

এই সাফল্যের সঙ্গে ২০২১ সালের একটি ব্যর্থ মিশনের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। ওই বছরের আগস্টে ইসরো GSLV-F10 রকেটের মাধ্যমে GISAT-1 উৎক্ষেপণের চেষ্টা করেছিল। উচ্চ কক্ষপথ থেকে নিয়মিত নজরদারি চালানোর কথা ছিল উপগ্রহটির। কিন্তু দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজ সঠিকভাবে চালু না হওয়ায় মিশনটি ব্যর্থ হয়। ফলে মহাকাশে ভারতের একটি ‘চোখ’ বসানোর স্বপ্ন আরও পিছিয়ে যায়।

EOS-05 সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন।

এবার GSLV-F17 পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেছে। EOS-05 পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরে ভূ-সমলয় কক্ষপথের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। এই অবস্থান থেকে উপগ্রহটি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর প্রায় অবিচ্ছিন্ন নজর রাখতে পারবে।

সাধারণ পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ পৃথিবীর তুলনামূলক কাছাকাছি কক্ষপথে ঘোরে এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর কোনো এলাকার ওপর দিয়ে যায়। ফলে সেগুলো মূলত বিভিন্ন সময়ের ছবি দেয়। কিন্তু EOS-05 একই অঞ্চলের ওপর ধারাবাহিকভাবে নজর রাখতে পারবে। অর্থাৎ এটি অনেকটা স্থির ক্যামেরার মতো কাজ করবে।

উপগ্রহটি ভারতীয় উপমহাদেশ, আশপাশের সমুদ্র ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করবে। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড়, বাস্তব সময়ে বন্যার পরিস্থিতি, বনাঞ্চলে আগুন, কৃষি, পরিবেশের পরিবর্তন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো বিষয় পর্যবেক্ষণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্যও EOS-05 গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠবে। বেঙ্গালুরুর ইউআর রাও স্যাটেলাইট সেন্টারের নতুন পরিচালক ডিকে সিং উপগ্রহটিকে ‘আকাশের আরেকটি চোখ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

শ্রীহরিকোটায় উৎক্ষেপণের সময় মিশনটির কৌশলগত গুরুত্বও স্পষ্ট হয়। ভারতীয় নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উৎক্ষেপণ প্রত্যক্ষ করতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। উপগ্রহটির ধারাবাহিক নজরদারি সক্ষমতা সমুদ্রপথে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কার্যকর করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে সহায়তা করতে পারে।

নতুন প্রজন্মের উৎক্ষেপণযান নিয়ে বিশ্ব এগিয়ে গেলেও GSLV Mk II যে এখনো গুরুত্বপূর্ণ, এই উৎক্ষেপণ তা আবারও প্রমাণ করেছে। গত বছর এই একই পরিবারের রকেট সফলভাবে NISAR উৎক্ষেপণ করেছিল। NASA-ISRO Synthetic Aperture Radar-এর সংক্ষিপ্ত রূপ NISAR। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বেসামরিক পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচনা করা হয়। ওই মিশন GSLV প্ল্যাটফর্মের সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করেছিল।

এবার EOS-05 সেই তালিকায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য যোগ করল। ২ হাজার ৩৭৬ কেজি ওজনের উপগ্রহটি সুস্থ আছে এবং প্রত্যাশার চেয়েও ভালো কক্ষপথ পেয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এটিকে চূড়ান্ত ভূ-স্থির কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া হবে।

ইসরোর চেয়ারম্যান ড. ভি. নারায়ণন সংস্থাটির কাজের দর্শন তুলে ধরে বলেন, ‘পরিশ্রমের পুরস্কার হলো আরও বেশি কাজ।’ তিনি এটিকে ‘ইসরোর উন্মুক্ত কর্মসংস্কৃতির কারণে একটি বড় অর্জন’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

তবে এই সাফল্যের পরও ইসরোর সামনে বিশ্রামের সুযোগ নেই। চলতি অর্থবছরে আরও ছয়টি উৎক্ষেপণ পরিকল্পনায় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গগনযান কর্মসূচি। চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রথম মানুষবিহীন গগনযান মিশন উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নিয়েছে ভারত। এটি ভারতের মাটি থেকে ভারতীয় মহাকাশযানে ভারতীয় নভোচারীকে কক্ষপথে পাঠানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

GSLV-F17-এর সফল উৎক্ষেপণ তাই শুধু একটি রকেট উৎক্ষেপণের সাফল্য নয়। এটি সাম্প্রতিক ব্যর্থতার পর ইসরোর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়েছে, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা GSLV Mk II-এর সক্ষমতা আবারও প্রমাণ করেছে এবং ২০২১ সালে থেমে যাওয়া একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, EOS-05-এর মাধ্যমে ভারত তার ভূখণ্ড ও আশপাশের অঞ্চলগুলোর ওপর দীর্ঘ সময় ধরে নজর রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা পেয়েছে।

৪ সেপ্টেম্বর ভোরে যখন ভারতের অধিকাংশ মানুষ ঘুম থেকে জাগার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ইসরো বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করে ফেলেছে। একসময় ব্যর্থতার জন্য যে রকেটের নাম হয়েছিল ‘দুষ্টু ছেলে’, সেই রকেটই এবার সাফল্যের বার্তা নিয়ে মহাকাশে ছুটেছে।