০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০১

এআই দিয়ে দ্রুত হোমওয়ার্ক, পরীক্ষায় নম্বর কমছে শিক্ষার্থীদের

প্রতীকী ছবি  © টিডিসি এআই সম্পাদিত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে দ্রুত হোমওয়ার্ক শেষ করছে শিক্ষার্থীরা। বাড়ছে বাড়ির কাজের নম্বরও। তবে এআই ছাড়া পরীক্ষায় বসলে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের পর শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কের নম্বর ১৮ শতাংশ বাড়লেও ছয় মাসের মধ্যে মাসিক পরীক্ষায় তাদের ফল ২০ শতাংশ কমেছে। এতে দ্রুত কাজ শেষ করার সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। চীনে বছরে অন্তত আট ঘণ্টা এআই বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারও তাদের পাঠ্যক্রমে এআই যুক্ত করতে শুরু করেছে। এআই চ্যাটবট শিক্ষার্থীদের শেখার কাজকে সহজ ও দ্রুত করতে পারে। কোনো বিষয় বুঝতে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়। তবে শিক্ষার্থীরা যখন এআইয়ের সাহায্য ছাড়া পরীক্ষায় বসে, তখন তাদের অর্জিত জ্ঞানের প্রকৃত চিত্র সামনে আসে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এআইয়ের মাধ্যমে করা কাজের কতটা শিক্ষার্থীরা নিজেরা শিখছে এবং কতটা প্রযুক্তির মধ্যেই থেকে যাচ্ছে।

হোমওয়ার্কে নম্বর বাড়লেও পরীক্ষায় কম

শিক্ষায় এআইয়ের প্রভাব নিয়ে বড় পরিসরে একটি গবেষণা করেছেন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড স্ট্রমবার্গ। তার সঙ্গে ছিলেন হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিক্টর লেই ও ইয়ানহুই উ। চীনের ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে ৩০ মাস ধরে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় হোমওয়ার্কের তথ্যের পাশাপাশি মাসিক বই না দেখে দেওয়া পরীক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষার ফলও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মোট নয়টি বিষয়ের তথ্য এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষণায় স্কুলের কাজ করা এবং সেই কাজ থেকে প্রকৃতপক্ষে শেখার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে।

জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের পর শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কের নম্বর ১৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে তাদের সময় কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এআই ব্যবহারের আগে একটি অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে শিক্ষার্থীদের গড়ে ৬৪ মিনিট সময় লাগত। এআই ব্যবহারের পর সেই সময় কমে দাঁড়ায় ৪৫ মিনিটে। অর্থাৎ কম সময়ে শিক্ষার্থীরা হোমওয়ার্ক শেষ করতে পেরেছে। কাজের নম্বরও বেড়েছে।
তবে এআই ছাড়া পরীক্ষায় বসার পর চিত্র বদলে যায়। একই শিক্ষার্থীদের মাসিক পরীক্ষার ফল ছয় মাসের মধ্যে ২০ শতাংশ কমে যায়।

উচ্চঝুঁকির ভর্তি পরীক্ষাতেও তাদের পারফরম্যান্স কমেছে। সেখানে এআই ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব পুরোপুরি স্পষ্ট হতে তুলনামূলক বেশি সময় লেগেছে। গবেষণার ফল তাই এআই ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের কাজ দ্রুত শেষ করতে সাহায্য করলেও, সেই কাজ থেকে তারা কতটা জ্ঞান অর্জন করছে তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

পড়াশোনার বাইরেও এআইয়ের প্রভাব

শিক্ষার্থীদের জীবনে এআই এখন শুধু হোমওয়ার্ক বা স্কুলের কাজ শেষ করার একটি মাধ্যম নয়। সামগ্রিক শিক্ষার্থীজীবনের অভিজ্ঞতার অংশও হয়ে উঠছে এটি। পড়াশোনায় তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিষয়েও অনেকে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের ২০২৬ সালের HEPI/Kortext Student Generative AI Survey-তে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। ১ হাজার ৫৪ জন পূর্ণকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপে ৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, এআই তাদের শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা উন্নত করেছে। সময় বাঁচানো, বিষয়বস্তু আরও ভালোভাবে বোঝা এবং তাৎক্ষণিক ও ব্যক্তিগত সহায়তাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা। এআইয়ের প্রভাব পড়াশোনার বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে। এবারের জরিপে প্রথমবারের মতো শিক্ষার্থীদের একাকিত্বের বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়।

জরিপে ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, এআই তাদের একাকিত্বের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনেনি। অন্যদের মধ্যে মতামত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত। ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছে, এআই ব্যবহারে তারা কম একাকিত্ব অনুভব করে। বিপরীতে ২০ শতাংশ জানিয়েছে, এআই ব্যবহারের ফলে তারা আরও বেশি একাকিত্ব অনুভব করে।

গবেষণা ও জরিপের ফল বলছে, শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব একেবারে নেতিবাচক নয়। এটি শিক্ষার্থীদের সময় বাঁচাতে পারে। কঠিন বিষয় বুঝতে সাহায্য করতে পারে। তাৎক্ষণিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহায়তাও দিতে পারে। তবে শিক্ষার্থীর হয়ে পুরো কাজ করে দেওয়ার বদলে শেখার সহায়ক হিসেবে এআই ব্যবহার করাই বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ হোমওয়ার্ক দ্রুত শেষ করার সুবিধার আড়ালে যদি শিক্ষার্থীর নিজের শেখার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে পরীক্ষায় তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর নিজস্ব শেখার সক্ষমতা ধরে রাখা। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা