০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৮

স্কুলে ‘এআই’ ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেন নিউইয়র্কের মেয়র মামদানি

নিউইর্য়কের মেয়র জোহরান মামদানি   © সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নিউইয়র্ক সিটির সরকারি স্কুলগুলোতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানি। নতুন নীতিতে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময়ও সীমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের এআই সম্পর্কে সচেতন করতে বিশেষ পাঠ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ।

বুধবার মেয়র জোহরান মামদানি ও নগরীর অন্যান্য কর্মকর্তারা নতুন এই প্রযুক্তিনীতি ঘোষণা করেন। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে নীতিটি কার্যকর হবে। এর আওতায় নিউইয়র্কের সরকারি স্কুলের প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থী পড়বে, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

মেয়র মামদানি বলেন, ‘এই এক বছরের নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যৎকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার। আমরা নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করব, তবে তখনই, যখন সেটি আমাদের শিক্ষার্থীদের কাজে আসবে।’

নতুন নীতির আওতায় দ্বিতীয় প্রি-কে (২-কে) থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা জেনারেটিভ এআই টুল ও এআইভিত্তিক চ্যাটবট ব্যবহার করতে পারবে না। এ সময় শিক্ষক, অভিভাবক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জোট এআই প্রযুক্তির প্রভাব পর্যালোচনা করবে। পরে তারা এর ব্যবহার নিয়ে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ দেবে।

তবে উচ্চমাধ্যমিকের সীমিতসংখ্যক শ্রেণিকক্ষে কঠোর নজরদারির মধ্যে এআই ব্যবহারের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো যাবে। পাশাপাশি সব উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী বছরে দুবার এআই বিষয়ে বিশেষ পাঠ পাবে। এসব পাঠে এআইয়ের ব্যবহার, পক্ষপাত, নৈতিকতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অবশ্য এআই ব্যবহারে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা থাকছে না। তারা পাঠ পরিকল্পনা তৈরি এবং প্রশাসনিক কাজের জন্য এআই ব্যবহার করতে পারবেন। তবে ব্যবহৃত এআই টুলকে নগর কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিরাপত্তা মান পূরণ করতে হবে।

নতুন নীতিতে শিক্ষার্থীদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময়ও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে ছোট শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা একটি ডিভাইস ব্যবহারে বিধিনিষেধ থাকবে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৪৫ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

মেয়র মামদানি মনে করেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক ও সহপাঠীদের সরাসরি যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চান তিনি। তার মতে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের ও সহপাঠীদের সঙ্গে কাজ করে সমস্যা সমাধান এবং সামাজিক দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে।

নিউইয়র্কের স্কুলের প্রধানরা কয়েক মাস ধরেই নতুন নীতির অপেক্ষায় ছিলেন। নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সফটওয়্যার কেনা বন্ধ রাখতে গত জুলাইয়ে স্কুলের প্রধানদের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে মার্চে প্রকাশিত নির্দেশনায় শ্রেণিভেদে এআই ব্যবহারে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়নি।

শিশুদের ওপর এআই ও স্ক্রিননির্ভর শিক্ষার প্রভাব নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই নতুন এই নীতি নেওয়া হলো। বিভিন্ন অভিভাবক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়ে আসছিল। নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের অর্ধেকের বেশি সদস্যও একটি চিঠিতে নগর কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা বিভাগকে শ্রেণিকক্ষে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানো বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

নিউইয়র্কের ইউনাইটেড ফেডারেশন অব টিচার্সের (ইউএফটি) সভাপতি মাইকেল মালগ্রু বলেন, এআই নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগই স্কুলে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো করেছে।

সম্প্রতি ‘আপ ক্লোজ’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মালগ্রু বলেন, ‘এআই নিয়ে অভিভাবকেরা খুব, খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। কারণ তারা এআই নিয়ে শুধু ভয়াবহ সব ঘটনা শুনছেন। আর তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের সন্তানদের নিয়ে সুরক্ষামূলক অবস্থান নিচ্ছেন।’

মালগ্রু এআইকে ‘খুবই বিপজ্জনক একটি বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, নতুন কোনো এআই পণ্য যথাযথভাবে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত স্কুলগুলোর তা ব্যবহার করা উচিত নয়। শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে শিক্ষক ও স্কুলের প্রধানদের কাছে নতুন নীতির বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।

এআই ব্যবহারে বিধিনিষেধের সমর্থকেরা বলছেন, এআইনির্ভর অনেক শিক্ষামূলক কর্মসূচির শিক্ষাগত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তার বদলে প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।

কিছু শিক্ষামূলক অ্যাপেরও সমালোচনা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব অ্যাপ অনেকটা ভিডিও গেমের মতো। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রচলিত পদ্ধতিতে শেখার বদলে প্রযুক্তির সাহায্যে সহজে কাজ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এ ধরনের উদ্বেগই গত শিক্ষাবর্ষের শুরুতে নিউইয়র্ক সিটির স্কুলগুলোতে কার্যকর হওয়া স্কুল চলাকালীন পুরো সময়ের মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল। তখন শিক্ষক ও অভিভাবকেরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হওয়ার প্রবণতা কমানো এবং পড়াশোনায় তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন।

ঘোষণার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে মেয়র মামদানি বলেন, ‘প্রযুক্তি শিল্প আমাদের বিশ্বাস করাতে চায় যে ছোট শিশুদের শিক্ষায় এআই ব্যবহার শুধু অনিবার্যই নয়, বরং প্রয়োজনীয়ও। আমরা বিষয়টিকে এভাবে দেখি না।’