০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৫

২০০ বছরের ইতিহাস ভেঙে মার্কিন মুদ্রায় বসল জীবিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখ!

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি সম্বলিত মুদ্রা  © সংগৃহীত

প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো জীবিত ব্যক্তির মুখ স্থান পেল যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায়। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিকৃতি সংবলিত নতুন ১ ডলারের কয়েন বাজারে ছেড়েছে মার্কিন মুদ্রা কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে তৈরি এই কয়েন নিয়ে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বিতর্ক ও সমালোচনা।

মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় অনুযায়ী, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় নতুন এই কয়েন বাজারে ছাড়া ও বিক্রি শুরু করে মার্কিন মুদ্রা কর্তৃপক্ষ।মুদ্রা বিভাগ এটিকে ‘এক প্রজন্মে একবার’ আসা একটি কয়েন হিসেবে বর্ণনা করেছে।

সোনালি রঙের কয়েনটির এক পাশে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিকৃতি। এর পাশে লেখা রয়েছে ‘স্বাধীনতা’ ও ‘আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি’। কয়েনটির অন্য পাশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সিলের ছবি। সেই সিলের ঢালের ওপর লেখা রয়েছে ‘২৫০’।

মার্কিন মুদ্রা বিভাগ বলেছে, কয়েনগুলো ‘গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্ষিকীর দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি দেশের চেতনা, গর্ব ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে।’

তবে জীবিত অবস্থায় ট্রাম্পের ছবি মুদ্রায় ব্যবহার করায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় সাধারণত দেশটির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মৃত ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘ সময় পর এবারই প্রথম কোনো জীবিত ব্যক্তির ছবি যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় স্থান পেল।

ট্রাম্প গত বছর আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর তার প্রশাসন বিভিন্ন ভবন ও সরকারি সামগ্রীতে তার নাম বা ছবি যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে কেনেডি সেন্টার, ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিস, ন্যাশনাল পার্কসের পাস, বিশেষ সংস্করণের পাসপোর্ট এবং গত বছর ঘোষিত ১০ লাখ ডলারের ‘গোল্ড কার্ড’ ভিসা রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন এসব উদ্যোগের কিছু অংশকে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ বছর বিভিন্ন আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত ১৫ জুলাই মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে প্রথম নতুন এই কয়েনের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই কয়েন ‘আমেরিকান মূল্যবোধের শক্তি এবং সবার স্বাধীনতা রক্ষায় নিবেদিত একটি দেশের প্রতিশ্রুতি উদযাপন করে।’

ট্রাম্প প্রশাসন এই কয়েন তৈরির পক্ষে যুক্তি দিতে অতীতের একটি বার্ষিকী কয়েনের উদাহরণও দিয়েছে।

১৯২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দেশটির টাকশাল জর্জ ওয়াশিংটন ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজের পাশাপাশি প্রতিকৃতি থাকা একটি কয়েন তৈরি করেছিল।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, ১৯২৬ সালের ওই কয়েনটি ছিল স্মারক মুদ্রা। সেটি সাধারণ লেনদেনে ব্যবহারের জন্য বাজারে ছাড়া হয়নি। ফলে ট্রাম্পের ছবি থাকা নতুন কয়েনটির সঙ্গে ওই মুদ্রার সরাসরি তুলনা করা যায় না।

এদিকে ট্রাম্পকে নিয়ে আরও একটি মুদ্রার পরিকল্পনা সামনে এসেছে। গত মে মাসে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, ট্রাম্পের ছবি থাকা নতুন ২৫০ ডলারের নোট ছাপানোর প্রস্তুতি চলছে।

তিনি আরও জানিয়েছিলেন, নতুন এই নোট চালুর জন্য ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করছে।

নতুন ১ ডলারের কয়েনটির সরকারি মূল্য ১ ডলার। তবে মার্কিন টাকশাল এটি সাধারণ মূল্যমানের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে। ২৫টি কয়েনের একটি রোল কিনতে খরচ হবে ৬১ ডলার। আর ১০০টি কয়েনের একটি ব্যাগের দাম ১৫৪ দশমিক ৫০ ডলার।

অর্থাৎ, ১ ডলারের মূল্যমান থাকলেও সংগ্রহের জন্য বিক্রির ক্ষেত্রে কয়েনটির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি রাখা হয়েছে।

তবে বাড়তি দামে বিক্রি হলেও মার্কিন টাকশাল জানিয়েছে, কয়েনগুলো শুধু সাজিয়ে রাখার জন্য তৈরি করা হয়নি। এগুলো বৈধ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। সাধারণ ১ ডলারের নোটের মতোই দৈনন্দিন কেনাকাটায় এসব কয়েন দিয়ে মূল্য পরিশোধ করা যাবে।

তবে জীবিত ব্যক্তির ছবি মুদ্রায় ব্যবহারের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের আইনে একটি প্রশ্নও তৈরি করেছে।

মার্কিন ফেডারেল আইনে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ও সিকিউরিটিজে শুধু মৃত ব্যক্তির প্রতিকৃতিই থাকতে পারে।’

১৮৬৬ সালে কংগ্রেস এই আইন পাস করে। এর আগে ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তা স্পেন্সার এম ক্লার্ক নিজের ছবি পাঁচ সেন্টের একটি নোটে ছাপিয়েছিলেন। এতে আইনপ্রণেতারা ক্ষুব্ধ হন। এরপরই জীবিত ব্যক্তির ছবি মুদ্রায় ব্যবহারের বিষয়ে এই আইন করা হয়।

তবে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালের ‘সার্কুলেটিং কালেকশন কয়েন রিডিজাইন অ্যাক্ট’ নামে একটি আইনে স্বাক্ষর করেন। এই আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকীর প্রতীক বহনকারী ১ ডলারের কয়েন তৈরির ক্ষমতা ট্রেজারিকে দেওয়া হয়।

ওই আইনে কয়েনের উল্টো পাশে কোনো ‘জীবিত বা মৃত’ ব্যক্তির প্রতিকৃতি রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তবে নতুন ১ ডলারের কয়েনে ট্রাম্পের ছবি রয়েছে সামনের দিকে। অর্থাৎ, কয়েনের সম্মুখভাগে তার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে নতুন কয়েনটি ওই আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবু কয়েনটি নিয়ে বিরোধিতা শুরু হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে নেভাডার ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্যাথরিন কর্টেজ মাস্টো এবং ওরেগনের সিনেটর জেফ মার্কলি এমন একটি আইন প্রস্তাব করেছিলেন, যাতে ট্রাম্পকে কয়েনে নিজের ছবি ব্যবহারের সুযোগ থেকে বিরত রাখা যায়।

ক্যাথরিন কর্টেজ মাস্টো তখন বলেছিলেন, ‘রাজারা তাদের মুখ কয়েনে বসান, কিন্তু আমেরিকায় কখনো কোনো রাজা ছিল না এবং ভবিষ্যতেও কোনো রাজা থাকবে না। আমাদের এই আইন আমেরিকার দীর্ঘদিনের সেই ঐতিহ্যকে আইনি ভিত্তি দেবে, যেখানে জীবিত প্রেসিডেন্টদের ছবি আমেরিকান কয়েনে রাখা হয় না। কংগ্রেসের উচিত কোনো দেরি না করে এই আইন পাস করা।’

তাদের আনা বিলটি অবশ্য আইনে পরিণত হয়নি।

বুধবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে কর্টেজ মাস্টো নতুন কয়েন বাজারে ছাড়ার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প দেশের আরও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানের বদলে ‘নিজের ভাবমূর্তি কেন্দ্রিক প্রকল্প’কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

সিনেটর বলেন, ‘ট্রাম্পের ছবি থাকা এই ১ ডলারের কয়েন আমেরিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট ও মার্কিন মুদ্রা বিভাগ যে এই কয়েন তৈরি ও বিক্রির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন, তা মেনে নেওয়া যায় না।’

এ বিষয়ে আল জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ও যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা বিভাগ।