০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২০

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের এখনো সরাতে চায় ইসরায়েল: প্রতিরক্ষামন্ত্রী

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরাতে চায় ইসরায়েল   © সংগৃহীত

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা এখনো ইসরায়েলের আলোচনায় আছে বলে স্বীকার করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। তাঁর দাবি, ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে না দিলে গাজা সংকটের ‘কোনো বাস্তব সমাধান’ সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিকল্পনাটি বাতিল করেননি, শুধু স্থগিত রেখেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েনেট আয়োজিত এক সম্মেলনে বক্তব্য দেন কাটজ। সেখানে তিনি বলেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়াকে ইসরায়েলের কিছু কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় ‘অভিবাসন’ বা ‘স্থানান্তর’ হিসেবে বর্ণনা করলেও এটিই এখনো গাজা সংকটের ‘একমাত্র সমাধান’ বলে মনে করেন তিনি।

দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের বরাতে কাটজ বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের এই স্থানান্তর ছাড়া গাজার কোনো বাস্তব সমাধান নেই।’

প্রায় তিন বছর ধরে ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করে আসছেন, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং সেখানে জাতিগত নির্মূল চালানো।

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী কয়েকজন কর্মকর্তা এর আগেও প্রকাশ্যে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁর প্রথম মেয়াদের শুরুতে এই ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং অঞ্চলটির ‘মালিকানা’ করবে।

ট্রাম্পের এই প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এমনকি ওয়াশিংটনের মিত্র দেশগুলোর সরকারও এর বিরোধিতা করে।

এরপর ট্রাম্প একটি ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির উদ্যোগ নেন। ওই চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূখণ্ডে থাকার অধিকার স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়।

চুক্তির ১২ দফার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘কাউকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। যারা গাজা ছাড়তে চান, তারা স্বাধীনভাবে যেতে পারবেন এবং চাইলে আবার ফিরে আসতে পারবেন।’

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, ‘আমরা মানুষকে গাজায় থাকার জন্য উৎসাহিত করব এবং তাদের আরও উন্নত গাজা গড়ে তোলার সুযোগ করে দেব।’

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে তারা উপত্যকাটির পুনর্গঠন কার্যক্রমও আটকে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিনই ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

কাটজ বলেন, ইসরায়েলি সরকার গাজার নিয়ন্ত্রণ নিতে ‘সমুদ্রপথে, আকাশপথে এবং যেকোনো উপায়ে’ অভিযান চালাতে প্রস্তুত। তবে গাজার সঙ্গে সীমান্ত থাকা মিসর ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।

বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করতে পারে এমন অন্য দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা প্রয়োজন বলেও জানান কাটজ। তবে ওয়াশিংটন গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিল করেনি বলে দাবি করেন তিনি।

কাটজ বলেন, ‘এই মুহূর্তে ট্রাম্প এটি বাতিল করেননি; তিনি এটি স্থগিত রেখেছেন।’

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাটি ‘সব সময়ই আলোচনা হচ্ছে’।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত সবার স্বার্থেই এর বাইরে আর কোনো সমাধান নেই। তবে এটি বাস্তবায়ন করতে আমাদের যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন হবে এবং সেই সময় আসবে।’

গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ইসরায়েলি সরকারকে সমর্থন করেছে।

গাজায় সংঘটিত নৃশংসতার তদন্ত করা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

জুলাইয়ে ট্রাম্প হামাসকে নিরস্ত্র করার বিষয়ে একটি সমঝোতার কথা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত ওই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে প্রাণঘাতী হামলা বন্ধ করার কথা ছিল।

তবে ইসরায়েল ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়, গাজা পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো ছাড় দেবে না।

কাটজের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন বলেন, গত বছর গাজা-মিসর সীমান্ত পরিদর্শনের পর তিনি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির আরেক সিনেটর জেফ মার্কলি সতর্ক করেছিলেন যে, ইসরায়েল গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার পরিকল্পনা করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান হলেন লেখেন, ‘এখন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে এটাই লক্ষ্য। আমাদের এই কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’