‘এআই’ ভিডিও প্রকাশ করে ট্রাম্প—‘খার্গ দ্বীপকে টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে!’
ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপে হামলার দাবি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ দিয়ে তৈরি ভিডিও প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভিডিওটি প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, ‘খার্গ দ্বীপকে টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে!!! প্রেসিডেন্ট ডিজেটি।’ তবে বাস্তবে খার্গ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে—এমন কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দুটি এআই-তৈরি ভিডিও শেয়ার করেছেন। এর একটি ভিডিওতে ইরানের খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল বা ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি ভিডিওটিতে একটি তেল সংরক্ষণাগার ও একটি তেলবাহী জাহাজে ভয়াবহ বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা যায়। একই সঙ্গে একটি বিমানকে ওই এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখা যায়।
ভিডিওটি শেয়ার করে ট্রাম্প লেখেন, ‘খার্গ দ্বীপকে টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে!!! প্রেসিডেন্ট ডিজেটি।’
ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টগুলো প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালায়। হরমুজ প্রণালির ছোট এই দ্বীপে থাকা ইরানের রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালায়। জুলাইয়ের শেষের পর ইরানের বিরুদ্ধে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলা।
ওয়াশিংটন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরান যাতে আরও সমুদ্র মাইন পেতে না পারে, তা ঠেকাতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ থেকে তারা বিস্ফোরক সরানোর কাজ শেষ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছে, ‘হরমুজ প্রণালিতে তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মাইন পাতা বাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী সীমিত ও নির্ভুল পদক্ষেপ নিয়েছে।’
তবে এখন পর্যন্ত খার্গ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র কোনো হামলা চালিয়েছে—এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি। অথচ ট্রাম্পের প্রকাশিত ভিডিওতে খার্গ দ্বীপে হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই ভিডিও ইরানকে ভয় দেখানোর একটি কৌশলও হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগেও তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি বিভিন্ন কনটেন্ট প্রকাশ করেছেন। এসব কনটেন্টে অনেক সময় বাস্তবতার তুলনায় ঘটনাকে অনেক বেশি বড় করে দেখানো হয়েছে, আবার কখনও বাস্তব ঘটনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই ছিল না।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে।
তবে জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের উৎস কোথায় ছিল, সে বিষয়ে তারা কিছু জানায়নি।
পরে তেহরান দাবি করে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতেও তারা মার্কিন সামরিক সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের জন্য খার্গ দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ও জ্বালানি কেন্দ্র। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে খার্গ দ্বীপে খুব কম তেলবাহী জাহাজ দেখা গেছে। তবে ওমানের পাশ দিয়ে বিকল্প একটি পথে অন্য দেশগুলোর তেলবাহী জাহাজ ওই জলপথ ব্যবহার করে চলাচল করছে।
ইরানের উপকূল থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরের উত্তর অংশে খার্গ দ্বীপের অবস্থান। এটি হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৪৮৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
খার্গ দ্বীপের চারপাশের পানির গভীরতা বড় আকারের তেলবাহী জাহাজের জন্যও উপযোগী। ফলে ইরানের মূল ভূখণ্ডের অগভীর উপকূলীয় এলাকায় যেসব বিশাল তেলবাহী জাহাজ ভিড়তে পারে না, সেগুলোও এই দ্বীপে সহজেই নোঙর করতে পারে।
খার্গ দ্বীপে কোনো হামলা হলে ইরানের জ্বালানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনীতির ওপরও ব্যাপক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। ফলে খার্গ দ্বীপের ওপর হামলা হলে শুধু ইরানের অর্থনীতিই নয়, দেশটির তেল রপ্তানি ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।