বিড়ালের কান্না ভেবে খোঁজ, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যেভাবে উদ্ধার হলো ৬ বছরের মণীষা মাগার
চারদিকে শুধু কাদা, ভাঙা বাড়ি আর উপড়ে পড়া গাছ। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তিন দিন ধরে নিখোঁজদের খুঁজছিলেন উদ্ধারকারীরা। একপর্যায়ে হঠাৎ শোনা গেল ক্ষীণ কান্নার শব্দ। শব্দটি শুনে অনেকে ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো বিড়াল আটকে আছে। কিন্তু একটু পর মাটি-কাদা সরাতেই সামনে আসে অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য—ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত অবস্থায় পড়ে আছে ছয় বছরের এক শিশুকন্যা। তার নাম মণীষা মাগার।
নেপালের টিমুরে গ্রামের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই শুক্রবার সন্ধ্যায় মণীষাকে উদ্ধার করেন আর্মড পুলিশ ফোর্সের (এপিএফ) সদস্যরা। প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে মাটি, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পরও তাকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পান তারা। তার এই উদ্ধারের ঘটনা ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপালে নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে।
টিমুরে গ্রামজুড়ে তখন ধ্বংসের চিহ্ন। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ভেঙে পড়া বাড়ির অংশ, ইট-কাঠ, গাছের গুঁড়ি ও কাদা। হড়পা বানের স্রোতে গ্রামের অনেক কিছুই ভেসে গেছে বা মাটির নিচে চাপা পড়েছে। উদ্ধারকারীরা একটানা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান করছিলেন।
তিন দিন ধরে অভিযান চালানোর পর জীবিত কাউকে পাওয়ার আশা অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছিলেন উদ্ধারকারীরা। এমন সময় তারা মাটির নিচ থেকে একটি ক্ষীণ কান্নার শব্দ শুনতে পান। শব্দটি কোথা থেকে আসছে, তা প্রথমে বুঝতে পারেননি তারা। উদ্ধারকারী দলের কয়েকজনের ধারণা হয়েছিল, হয়তো কোনো বিড়াল ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছে।
তবে আর্মড পুলিশ ফোর্সের সদস্যরা সময় নষ্ট করেননি। তারা দ্রুত শব্দের উৎস শনাক্ত করে হাতের কাছে থাকা সরঞ্জাম দিয়ে মাটি ও কাদা সরাতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার হতে থাকে। একপর্যায়ে উদ্ধারকারীদের চোখে পড়ে একটি শিশুর মুখ।
সেখান থেকেই জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ছয় বছরের মণীষা মাগারকে।
উদ্ধারের সময় মণীষা প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে কাদা, মাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিল। এত দীর্ঘ সময় সেখানে আটকে থাকার পরও তাকে জীবিত পাওয়া উদ্ধারকারীদের জন্য ছিল এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনার পর দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
মণীষাকে উদ্ধারের পরই কাঠমাণ্ডুতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেদিন তাকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে শুক্রবার রাতটি উদ্ধারকারী দলের ক্যাম্পেই কাটাতে হয় মণীষাকে। সেখানে তাকে খাবার দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় যত্ন নেওয়া হয়।
পরদিন শনিবার দুপুরে আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলে মণীষাকে হেলিকপ্টারে করে কাঠমাণ্ডুতে নেওয়া হয়। পরে তাকে সেখানকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকেরা তার শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখছেন।
তবে মণীষাকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও তার পরিবারের কোনো সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। তার বাবা-মা কিংবা অন্য আত্মীয়স্বজন কোথায় আছেন, তা জানা যায়নি। নেপাল প্রশাসন এখন মণীষার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
মণীষার পরিচয় জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পোস্ট করা হয়েছে। কেউ যদি তাকে বা তার পরিবারের সদস্যদের চিনে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে মণীষাকে উদ্ধারের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে শিশুটিকে উদ্ধারের দৃশ্য দেখে নেটিজেনরা উদ্ধারকারীদের প্রশংসা করেছেন। অনেকে তাদের সাহস ও দায়িত্ববোধের প্রশংসা করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একজন লিখেছেন, ‘হাল না ছাড়া মনোভাবের জয়।’
নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান ও বন্যায় পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। রবিবার পর্যন্ত হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো ২ হাজার ৫০২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ৫০২ জন বিদেশি নাগরিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনায় মরদেহ সংরক্ষণ নিয়েও সমস্যায় পড়েছে নেপাল সরকার। দেশটির বিভিন্ন মর্গে মরদেহের চাপ বেড়েছে। জায়গার সংকটে মরদেহ সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে।
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের মধ্যে যেখানে প্রতিদিনই নতুন করে মৃত্যুর খবর আসছে, সেখানে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ছয় বছরের মণীষা মাগারকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা নেপালের মানুষের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। তিন দিন ধরে মাটি ও কাদার নিচে আটকে থাকার পরও তার বেঁচে থাকা এবং উদ্ধারকারীদের নিরলস প্রচেষ্টায় তাকে জীবিত ফিরে পাওয়ার গল্প এখন বিপর্যস্ত নেপালে বেঁচে থাকার এক অনন্য বার্তা হয়ে উঠেছে।