৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৮

নেপালের পর এবার যুক্তরাষ্ট্রে আকস্মিক বন্যা, নিখোঁজ অন্তত ২০

যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে আকস্মিক বন্যা  © সংগৃহীত

নেপালের ভয়াবহ বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আকস্মিক বন্যার কবলে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পর্যটন এলাকা গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। হঠাৎ নেমে আসা প্রবল পানির স্রোত ভাসিয়ে নিয়েছে সেতু, বিশাল পাথর ও নানা স্থাপনা। বন্যার পর ২০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে বদলে গেছে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কিছু অংশের ভূপ্রকৃতিও।

যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কের ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্যানিয়ন ও ফ্যান্টম র‍্যাঞ্চ এলাকায় শনিবার এই আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস জানিয়েছে, প্রবল পানির স্রোতে বড় বড় পাথর, ধাতব কাঠামো ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাবশেষ ভেসে কলোরাডো নদীতে গিয়ে পড়ে।

বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় থাকা মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে অ্যারিজোনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস। একই সঙ্গে ওই এলাকায় থাকা নিখোঁজ ব্যক্তি বা হাইকারদের বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে তা কর্তৃপক্ষকে জানাতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে কলোরাডো নদীতে গিয়ে মেশা ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্রিকে বন্যার পানি হঠাৎ বাড়তে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই পানির স্রোত এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে ক্রিকের ওপর থাকা কয়েকটি পায়ে হাঁটার সেতু ভেসে যায়। একই সঙ্গে পানির প্রবল স্রোত আশপাশের ভূপ্রকৃতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়।

এলাকার বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, বন্যার পানির কারণে ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্রিকের তলদেশ আগের তুলনায় অনেকটা প্রশস্ত হয়ে গেছে। প্রবল স্রোতের কারণে সেখানে নতুন একটি জলপ্রপাত বা নদীর তীব্র স্রোতের অংশ তৈরি হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর কলোরাডো রিভার স্টাডিজের পরিচালক জ্যাক শ্মিট বলেন, ‘এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন কতটা পরিবর্তনশীল ও সক্রিয় একটি ভূপ্রকৃতি।’

বন্যার সময় সেখানে থাকা এবং পরে নিরাপদে উদ্ধার হওয়া এরিকা ভিওলা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, শনিবার বিকেলে বৃষ্টি শুরু হওয়ার সময় তিনি ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্যাম্পগ্রাউন্ডে ছিলেন। তখন তার সঙ্গে সেখানে প্রায় ৫০ জন হাইকারও ছিলেন।

ভিওলা জানান, তারা প্রথমে ক্রিকের পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে দেখেন। এরপর পানির স্রোতের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাবশেষ ভেসে যেতে শুরু করে। সেসব ধ্বংসাবশেষের মধ্যে একটি দেখতে অনেকটা থাকার ঘরের মতো ছিল।

পরে হেলিকপ্টারে করে ওই দলটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ভিওলা জানান, এর ফলে তার নির্ধারিত ভ্রমণ দুই দিন আগেই শেষ হয়ে যায়।

ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের ফ্ল্যাগস্টাফ কার্যালয়ের আবহাওয়াবিদ জাস্টিন জোহনড্রো জানান, ওই পাথুরে এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে আধা ইঞ্চি থেকে ১ ইঞ্চি বা প্রায় ১ থেকে ২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এলাকাটিতে ভূমির উচ্চতার পার্থক্য অনেক বেশি এবং ঢালও বেশ খাড়া।

জোহনড্রো বলেন, ‘বৃষ্টির বেশির ভাগ পানিই সঙ্গে সঙ্গে নিচের দিকে নেমে গেছে।’

তিনি জানান, গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের উত্তর পাশে এই বন্যা দেখা দেয়। ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্রিক নর্থ রিম থেকে নিচের দিকে নেমে কলোরাডো নদীতে গিয়ে মিশেছে। পথে ক্রিকটি প্রায় ৬ হাজার ফুট বা ১ হাজার ৮২৮ মিটার নিচে নেমে এসেছে। ফলে অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টি হলে সেই পানি দ্রুত নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।

ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস জানিয়েছে, রোববার সকাল পর্যন্ত ফ্যান্টম র‍্যাঞ্চ এলাকা থেকে ৬২ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক এই এলাকায় একটি ক্যান্টিন ও থাকার জন্য ডরমিটরি রয়েছে। কলোরাডো নদীতে রাফটিং করতে যাওয়া মানুষের জন্য ফ্যান্টম র‍্যাঞ্চ নদীতে ওঠানামার একটি পরিচিত স্থান।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফ্যান্টম র‍্যাঞ্চ এলাকা থেকে আরও মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত বন্যায় কারও আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস জানিয়েছে, সোমবার পর্যন্ত ওই এলাকায় আরও বজ্রঝড় ও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নতুন করে আকস্মিক বন্যা, ধ্বংসাবশেষের স্রোত, পাহাড়ি পাথর ধসে পড়া এবং বিভিন্ন ট্রেইল ও নদীর অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।

এই আশঙ্কায় রোববারও গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা ব্রাইট অ্যাঞ্জেল ক্যাম্পগ্রাউন্ড, ফ্যান্টম র‍্যাঞ্চ এবং নর্থ কাইবাব ট্রেইলের কিছু অংশ বন্ধ রাখা হয়েছে। পার্ক কর্তৃপক্ষ এসব এলাকায় বন্যায় সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করছে।

এদিকে নিরাপত্তার কারণে কলোরাডো নদীতে রাফটিং কার্যক্রমও আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। উদ্ধারকারী ও পার্ক কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানেও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

ভয়াবহ এই আকস্মিক বন্যায় ২০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও কর্তৃপক্ষ এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা ও পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় থাকা মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধান এবং বন্যার কারণে পরিবর্তিত ভূপ্রকৃতি ও বিভিন্ন পথের নিরাপত্তা যাচাই করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।