৩০ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৭

মোবাইলে নেপালের বিধ্বংসী ভিডিও দেখেই চলেছেন? মানসিক স্বাস্থ্যে কি প্রভাব ফেলছে, জানুন

ভয়াবহ বন্যার দৃশ্য মস্তিষ্কে কি ধরণের প্রভাব ফেলে   © সংগৃহীত

কয়েক দিন ধরে মোবাইল খুললেই চোখে পড়ছে নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান, ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, মানুষ। একের পর এক ভিডিও দেখছেন, বারবার আপডেট খুঁজছেন। বাইরে থেকে হয়তো সব স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে—খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন, কাজে যাচ্ছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এসব ভয়াবহ দৃশ্য আপনার মনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। দিনের পর দিন এমন কনটেন্ট দেখতে থাকলে বাড়তে পারে উদ্বেগ, ভয়, মানসিক চাপ, এমনকি তৈরি হতে পারে ট্রমাও। তাহলে কীভাবে বুঝবেন আপনি ডুমস্ক্রোলিংয়ের শিকার? আর কীভাবে নিজেকে এই মানসিক চাপ থেকে দূরে রাখবেন?

গত চার দিন ধরে নিউজ চ্যানেল খুললেই চোখে পড়ছে একই ছবি—নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান। খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে বাড়িঘর, মানুষ। সময় যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তাদের পরিবার-পরিজনেরা।

শুধু নিউজ চ্যানেলেই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ার ফিড খুললেও একই চিত্র। কয়েক দিন পিছিয়ে গেলেও পরিস্থিতিটা খুব একটা বদলায়নি। তখন নেপালের বদলে মূল খবর ছিল অসম ও কেরালার বন্যা। অসহায় মানুষ, প্রকৃতির ভয়াবহ তাণ্ডব, দিল্লি-মুম্বাই-হরিয়ানায় ভারী বৃষ্টি—সবই ঘুরেফিরে আসছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এর আগে ছিল যুদ্ধ, আমেরিকা-ইরান সংঘাতসহ নানা ভয়াবহ ঘটনার ভিডিও। অ্যালগরিদমের কারণে একের পর এক এমন ডিসটার্বিং কনটেন্ট আপনার সামনে আসতে থাকে। আপনি ইচ্ছা করে দেখুন বা না দেখুন, ধ্বংস, মৃত্যু আর আতঙ্কের ছবি ও ভিডিও ক্রমাগত চোখের সামনে আসতেই থাকে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধরনের ভয়াবহ ছবি ও ভিডিও দিনের পর দিন দেখতে থাকলে আপনার মনের ওপর কী প্রভাব পড়ে?

হয়তো ভাবছেন, আপনার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আপনি স্বাভাবিকভাবেই খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন, কাজে যাচ্ছেন। কিন্তু ক্রমাগত এই ধরনের কনটেন্ট দেখা ধীরে ধীরে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

অফিস থেকে ফেরার পথে মোবাইলে রিল দেখতে শুরু করলে কিংবা রাতে বাড়ি ফিরে টিভি চালু করেই যদি আপনি এই ধরনের খবর খুঁজতে থাকেন, বারবার আপডেট দেখতে চান, তাহলে আপনিও ডুমস্ক্রোলিংয়ের শিকার হতে পারেন।

কয়েক দিন ধরে মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে? প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর দেখলে মন খারাপ হচ্ছে? হতাশ লাগছে? দিনের পর দিন এ ধরনের ডিসটার্বিং কনটেন্ট বিরামহীনভাবে দেখার কারণেও এমনটা হতে পারে।

এই ধরনের কনটেন্ট বারবার দেখলে মনের ওপর কী প্রভাব পড়ে, তা জানতে ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ডা. প্রশান্তকুমার রায় এবং স্নায়ু বিশেষজ্ঞ ডা. অনিমেষ করের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, নিয়মিত এমন ভয়াবহ কনটেন্ট দেখলে মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ক্রমাগত ডিসাস্টার কনটেন্ট দেখার ফল
ডা. অনিমেষ কর জানান, এই ধরনের কনটেন্ট বারবার দেখলে মস্তিষ্কের কিছু অংশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তিনি বলেন, ‘অ্যামিগডালা, প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্স, হাইপোথ্যালামাসের মতো অংশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এই জাতীয় কনটেন্ট। যার ফলে ব্রেনের কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়। অ্যামিগডালা হাইপার অ্যাক্টিভ হয়ে যায়।’

এর পাশাপাশি শরীরে স্ট্রেস হরমোন বা কর্টিসলের ক্ষরণও বাড়তে থাকে। কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই মানসিক চাপ বাড়ে।

ডা. কর বলেন, ‘মানুষ হাইপারসেন্সেটিভ হয়ে পড়ে। গ্লাস বা চামচ পড়ে যাওয়ার মতো সামান্য কিছুতেও ভয় পেয়ে যায়। অল্পেতেই ঘাবড়ে যেতে শুরু করেন। কর্টিসল বাড়লে, সঙ্গে হার্ট রেটও বাড়তে পারে।’

অর্থাৎ খুব সাধারণ কোনো ঘটনাতেও তখন অতিরিক্ত ভয় বা অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

নেগেটিভ বায়াস রিইনফোর্সমেন্ট
কর্টিসলের মাত্রা বাড়লে শুধু মনের ওপর নয়, শরীরের ওপরও প্রভাব পড়ে। মানসিক চাপের কারণে ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে সারাদিন ঝিমুনি ও ক্লান্তি তৈরি হয়। এর সঙ্গে আরও নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে মস্তিষ্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তখন মনের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। এমনকি সামান্য কোনো খারাপ ঘটনাও অনেক বড় হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ভাইকারিয়াস ট্রমাটাইজেশন
হঠাৎ কোনো ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লে মানুষের মনে যে ট্রমা তৈরি হয়, অন্যের সেই বিপর্যয়ের ছবি ও ভিডিও বারবার দেখলেও কিছু ক্ষেত্রে একই ধরনের মানসিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। একে ভাইকারিয়াস ট্রমাটাইজেশন বলা হয়। কেউ কেউ এটিকে সেকেন্ডারি ট্রমাও বলেন।

এর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে ফার্স্টহ্যান্ড ট্রমার মতোই হতে পারে। মানসিক, আবেগগত এমনকি শারীরিকভাবেও এর প্রভাব দেখা দিতে পারে।

ডা. প্রশান্তকুমার রায় জানান, ফার্স্টহ্যান্ড ট্রমা ও সেকেন্ডহ্যান্ড ট্রমার ক্ষেত্রে প্রভাবের মাত্রায় পার্থক্য থাকতে পারে। তবে ট্রমা প্রকাশের ধরন অনেকটাই একই রকম হতে পারে।

রাতে দুঃস্বপ্ন দেখা, কোনো কাজ করতে করতে বা কারও সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎ মনের মধ্যে সেই ভয়াবহ বন্যার দৃশ্য ভেসে ওঠা কিংবা সেই দৃশ্য মনে পড়ে ভয় পেয়ে যাওয়া—এসবই ট্রমার লক্ষণ হতে পারে।

তবে সবার ক্ষেত্রে এই ট্রমার প্রভাব এক রকম হয় না।

ডা. রায় বলেন, ‘কারও ক্ষেত্রে একটা ইমোশনাল ব্লান্টিং তৈরি হয়। তাই বার বার ওই একই কনটেন্টই একপ্রকার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে থাকে। আবার কারও মধ্যে ভয়, অ্যাংজ়াইটি, ইমপালসিভনেস বেড়ে যেতে পারে।’

অর্থাৎ কেউ ভয়াবহ কনটেন্ট দেখেও আবেগহীন হয়ে পড়তে পারেন, আবার কেউ একই কনটেন্ট বারবার দেখতে চাইতে পারেন। অন্যদিকে কারও মধ্যে ভয়, উদ্বেগ বা হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।

অ্যামিগডালা সক্রিয় হয়ে যায়
এই ধরনের ভয়াবহ কনটেন্ট দেখলে মস্তিষ্কের সারভাইভাল মেকানিজম সক্রিয় হয়ে যায়। অ্যামিগডালা হলো মস্তিষ্কের এমন একটি অংশ, যা জরুরি পরিস্থিতিতে শরীরকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সাহায্য করে।

এ কারণে অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যেতে পারে। একে অনেক সময় ইমার্জেন্সি ব্রেনও বলা হয়।

মস্তিষ্কের এই অংশ সব সময় বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে কাজ করে না। বরং সম্ভাব্য বিপদ থেকে আপনাকে রক্ষা করার জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে চায়। তাই এটি সব সময় মস্তিষ্ককে সতর্ক অবস্থায় রাখার চেষ্টা করে।

এর ফলে এমন কনটেন্টের দিকে আরও বেশি আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে, যা আপনাকে আরও বিচলিত করে।

তাৎক্ষণিক বিপদ মোকাবিলায় অ্যামিগডালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মস্তিষ্ককে এমন চাপের মধ্যে রাখলে শরীরেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। এমনকি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

কতটা ভয়ংকর হতে পারে এই ট্রমা?
কিছু ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দৃশ্য এবং প্রকৃতির কাছে মানুষের অসহায়ত্ব মনের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে সেই হতাশা এতটাই বাড়তে পারে যে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার মতো চিন্তাও মাথায় আসতে পারে।

ডা. প্রশান্তকুমার রায় বলেন, ‘কম ক্ষেত্রে হলেও সুইসাইডাল ভাবনা মনে আসাটা অস্বাভাবিক নয়।’

তাই ভয়াবহ কনটেন্ট দেখার পর যদি কারও আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, ঘুমের সমস্যা হয়, অতিরিক্ত অস্থিরতা তৈরি হয় বা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা আসে, তাহলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

এই পরিস্থিতিতে কী করবেন?
এ ধরনের মানসিক চাপ কমাতে সবার আগে মিডিয়া এক্সপোজার কমানো জরুরি। বিশেষ করে বারবার দুর্যোগের খবর এবং উত্তেজনা তৈরি করে এমন কনটেন্ট থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে।

যাকে আপনি বিশ্বাস করেন এবং যিনি আপনাকে শুধু উপদেশ দেবেন না, বরং আপনার কথা বুঝবেন, তার সঙ্গে কথা বলুন। নিজের মনের কথা জানান। আপনি কী অনুভব করছেন, সেটি তার সঙ্গে ভাগ করে নিন।

আশপাশের মানুষেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কেউ মানসিক চাপে থাকলে তাকে শুধু উপদেশ না দিয়ে তার কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে, এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ঘুমের সমস্যা হলে, অতিরিক্ত অস্থিরতা তৈরি হলে কিংবা সুইসাইডাল চিন্তা এলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

যাদের পেশাগত কারণে বা অন্য কোনো কারণে নিয়মিত এমন ভয়াবহ কনটেন্টের সঙ্গে থাকতে হয়, তাদের ওপর মানসিক চাপ আরও বেশি হতে পারে। তাই অবসর সময়ে বই পড়া, গান শোনা বা এমন কোনো কাজ করা জরুরি, যা মনকে কিছুটা স্বস্তি দেয়।

ঘুমানোর সময় মোবাইল বন্ধ করে রাখাও উপকারী। এতে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলেও সহজে নেতিবাচক কনটেন্ট দেখার সুযোগ কমে যাবে।

এই সমস্যা কাটতে কত দিন সময় লাগে?
ডা. রায় জানান, সাধারণত এ ধরনের সেকেন্ডহ্যান্ড ট্রমা দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে কমে যায়। তবে এই সময়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও দৈনন্দিন রুটিন ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

নিয়মিত কাজকর্ম করা, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় থাকার চেষ্টা করলে ধীরে ধীরে মানসিক চাপ কমতে পারে।

তবে দুই-তিন সপ্তাহ পরও যদি মানসিক চাপ বা অস্থিরতা না কমে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কেন উপদেশ না দিয়ে কথা শোনা জরুরি?
ডা. প্রশান্তকুমার রায় জানান, মানুষ যখন নিজের ইচ্ছায় বা প্রো-অ্যাক্টিভভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন, তখন তিনি মানসিকভাবে আরও শক্ত হয়ে ওঠেন।

কিন্তু অন্যের উপদেশ মেনে চলতে গিয়ে অনেক সময় সেই আত্মশক্তির অনুভূতি তৈরি হয় না। এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে অন্যের দেওয়া উপদেশ মানসিকভাবে আরও একটি চাপ তৈরি করতে পারে।

সাধারণভাবে প্রত্যেক মানুষই এ ধরনের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেন। তবে কারও বেশি সময় লাগে, আবার কারও কম। তাই এ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার পাশে থাকা।

অনেক সময় কাউকে উপদেশ দিতে গিয়ে তার খারাপ স্মৃতি আবার মনে করিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। যিনি উপদেশ দিচ্ছেন, তিনি কৌতূহলবশত কী ঘটেছিল তা জানতে চাইতে পারেন। সেই ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে তিনি অজান্তেই পুরোনো স্মৃতি উসকে দিতে পারেন।

এতে উল্টো ওই ব্যক্তি আরও বেশি ট্রমার মধ্যে চলে যেতে পারেন।

তাই তার স্মৃতি নিয়ে বারবার কথা না বলে বন্ধুর মতো পাশে থাকুন। তাকে ভরসা দিন। তার কথা শুনুন এবং তাকে বোঝান যে সে একা নয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সহায়তাকেই বলা হয় সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড।

নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান হোক কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগ—মানবিক বিপর্যয়ের ছবি ও ভিডিও থেকে পুরোপুরি চোখ সরিয়ে রাখা সব সময় সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে কতটা দেখছেন, কতবার দেখছেন এবং দেখার পর নিজের মধ্যে কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।