ভাইরাল হওয়া গিরং ইমিগ্রেশন সেন্টারে ৪ দিন পর পৌঁছাল চীনা উদ্ধারকারী দল
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার চার দিন পর অবশেষে গিরং ইমিগ্রেশন সেন্টারে পৌঁছেছে চীনা উদ্ধারকারী দল। বিশাল ঢেউয়ের মতো পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে পুরো সীমান্ত কমপ্লেক্সটি গ্রাস হয়ে যাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকারীরা দেখতে পান, সেখানে এখন ‘ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই নেই’। বন্যার সময় ওই ইমিগ্রেশন সেন্টারে ভারতীয় তীর্থযাত্রীসহ আধ্যাত্মিক গুরু সদগুরুর ইশা ফাউন্ডেশনের ৮০ সদস্যের একটি দলও অবস্থান করছিল।
ভয়াবহ এই বন্যায় গিরং ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট এবং আশপাশের অবকাঠামোর বড় একটি অংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। কাদা ও ধ্বংসাবশেষের পুরু স্তরের নিচে চাপা পড়েছে এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ। বন্যার শুরুতেই চেকপোস্টের ভবন ধ্বংস হওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
গিরং যাওয়ার বেশির ভাগ সড়ক ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ২১ সদস্যের চীনা উদ্ধারকারী দলকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। একটি প্রশিক্ষিত সার্চ ডগকে সঙ্গে নিয়ে তারা পাহাড় ও উপত্যকা অতিক্রম করেন। দড়ির সাহায্যে বন ও খাড়া পাহাড়ি পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা ধ্বংস হয়ে যাওয়া সীমান্ত কমপ্লেক্সে পৌঁছান।
উদ্ধারকর্মী জোউ মিংকি বলেন, ‘সেখানে কোনো সড়ক ছিল না। পুরো পথ ছিল ঘন বন আর খাড়া পাহাড়ে ভরা।’
তিনি বলেন, ‘কমপ্লেক্সে পৌঁছে যতদূর চোখ গেছে, ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায়নি।’
চীনের অংশে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেনি। এর বড় কারণ বেইজিংয়ের সেন্সরশিপ। তবে রয়টার্সের প্রকাশ করা গিরংয়ের ছবিতে দেখা গেছে, একটি ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চারপাশে নির্মাণসামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে। ইমিগ্রেশন সেন্টারের দিকে যাওয়া সড়কজুড়ে বড় বড় পাথর ও বোল্ডার পড়ে আছে। এতে বন্যার পানির ভয়াবহ শক্তির মাত্রা স্পষ্ট হয়েছে।
সড়কটির অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্তরের নিচে সড়কের অনেক অংশ চাপা পড়েছে। উপড়ে যাওয়া গাছের মোটা ডালপালা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে আছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসাবশেষ সরাতে খননযন্ত্র ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে তিব্বত ও নেপালের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দ্রুত চালু করতে কাজ করছেন তারা।
গত ২৫ আগস্ট তিব্বত সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর এটি নেপালের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বন্যার স্রোতে ঘরবাড়ি, যানবাহন ও সেতু ভেসে গেছে। এই দুর্যোগে ৬০০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। আরও প্রায় ২ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। জীবিত মানুষ এবং বিভিন্ন স্থানে আটকে থাকা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।
নেপালে প্রায় ৩২০ জন ভারতীয় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে, চীনের অংশে থাকা প্রায় ৪০০ ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছে ভারত সরকার। শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
বন্যার সবচেয়ে ভয়াবহ কিছু দৃশ্য গিরং বন্দর এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ফুটেজে দেখা যায়, হঠাৎ করে পানি ও কাদার বিশাল স্রোত কয়েক তলা ইমিগ্রেশন ভবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। ওই সময় সেখানে থাকা লোকজন প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন।
গিরং সীমান্ত বন্দর তিব্বত ও নেপালকে যুক্ত করেছে। কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরের উদ্দেশে যাওয়া প্রত্যেক পর্যটক ও তীর্থযাত্রীকে এখানকার ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। খাসা ও কোরালা এলাকাতেও সীমান্ত চেকপোস্ট রয়েছে। তবে গিরং পথটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যার সময় অন্তত ১৩০ জন মানুষ ইমিগ্রেশন সেন্টারে বা এর আশপাশে ছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দলটি ছিল ৮০ জনের। তারা ছিলেন সদগুরুর ইশা ফাউন্ডেশনের সদস্য।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রকাশ করা এক আবেগঘন ভিডিওতে সদগুরুকে কাঁদতে দেখা যায়। তিনি জানান, ১৯টি দেশের ৪৬ নারী ও ৩৪ পুরুষের ওই দলটি বন্যার কয়েক মিনিট আগে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে পৌঁছেছিল।
সদগুরু বলেন, ‘আক্ষরিক অর্থেই পুরো দলটি ভবনের ভেতরে ছিল... এটি একটি ভয়াবহ এবং অভাবনীয় ঘটনা।’
ভিডিওতে তার চারপাশে থাকা লোকজনকে কাঁদতে শোনা যায়।
তিব্বতের সাগা এলাকায় অবস্থানরত এই আধ্যাত্মিক গুরু জানান, ঘটনার কয়েক দিন আগে তিনি নিজেও একই ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে নিজের সফরসঙ্গীদের নিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘যে একই ভবনে আমরা মাত্র এক সপ্তাহ আগে ইমিগ্রেশনের কাজ করেছিলাম... সেই পুরো ভবনটিই ভেসে গেছে।’
বন্যা শুরু হওয়ার আগে ৫০ জনের বেশি ভারতীয় তীর্থযাত্রীর আরেকটি দল সীমান্ত চেকপোস্টের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল বলে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওই দলের সমন্বয়কারী সৈয়দ উমর ফারুকের বন্ধু ও স্বজনেরা জানিয়েছেন, দুর্যোগের পর থেকে তারা দলের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পর্যটন প্রতিষ্ঠান হিমালয়ান গ্লেসিয়ার থেকে আরও ৪০ জন পর্যটক একই চেকপোস্ট দিয়ে তিব্বতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাগর পান্ডে নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, বুধবারের পর থেকে তিনি দলের কারও কাছ থেকে কোনো খবর পাননি।
কর্ণাটকের ৪৫ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী রাকেশ নায়েকও ওই সময় ইমিগ্রেশন সেন্টারে ছিলেন। তিনি গত ১০ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করছেন।
রাকেশের বাবা বলেন, ‘বন্যা আসার সময় সে অফিসের ভেতরে ছিল। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।’
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত দম্পতি দীপক ও মধু আহুজাও বিপদের সময় কৈলাস তীর্থযাত্রার একটি দলের সঙ্গে ছিলেন। তাদের মেয়েদের ধারণা, বন্যার সময় তারা গিরংয়ের ইমিগ্রেশন অফিসের ভেতরেই ছিলেন।
দুই বোনের একজন বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা সবাই সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাবা-মাকে ফোন করতে শুরু করি। কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি।’
এদিকে নেপাল যখন ভয়াবহ এই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তখন ওই অঞ্চলে আবারও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কাছে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হওয়ায় এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
উদ্ধারকারী দলগুলোকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। কারণ, হ্রদটির পানির পরিমাণ বাড়তে থাকলে একসময় সেটি ভেঙে যেতে পারে। আর তা হলে হঠাৎ করে নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।