২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৫

নেপালে ফের ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা

উদ্ধার অভিযান   © এএফপি

নেপাল ও তিব্বতের হিমালয় সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর এবার নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সীমান্তের একটি নদীর উজানে এখনো পানি আটকে থাকায় সেই বাধা হঠাৎ ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক শ মানুষ। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটকও আছেন।

চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া লেন্দে নদীর তীর থেকে বিপুল পরিমাণ মাটি ও ধ্বংসাবশেষের একটি অংশ হঠাৎ নদীতে পড়ে যায়। এতে সৃষ্ট প্রবল পানির ঢল সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করে। নেপালের ভোতে কোসি ও ত্রিশূলী নদীর পথে থাকা গ্রাম ও শহরগুলোতে সেই ঢল আঘাত হানে। পানির তোড়ে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত ভেসে যায়।

সীমান্তের দুই পাশের কর্মকর্তারা বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের কয়েকটি জেলাতেও বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

নেপালে উদ্ধার অভিযানের সময় ধারণ করা আকাশপথের ভিডিওতে বন্যার ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও গ্রামের পর গ্রাম কাদায় ঢেকে গেছে, কোথাও ঘরবাড়ির কোনো চিহ্নও নেই। চারদিকে শুধু কাদা, ধ্বংসস্তূপ আর পানির স্রোত। পানির প্রবল তোড়ে পুরো রাস্তা, সেতু ও ভবন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

নেপালের সেনাবাহিনী উদ্ধারকাজে বিমান ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। ইতিমধ্যে তারা বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে। নদীর কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী লোকজনকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগকবলিত এলাকায় উদ্ধারকারীরা কাদা ও পুরু পলির মধ্যে নেমে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজছেন। বন্যার পানিতে বহু ভবনের নিচের তলা পুরোপুরি মাটির নিচে চাপা পড়েছে।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘পুরো গ্রাম ও বাজার এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’

নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটিতে অন্তত ১৬২ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ ৪০৩ জন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতের নাগরিক।

এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরাও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপালের পর্যটন বোর্ড।

তিব্বতের দিকেও বন্যা ও ভূমিধসে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সীমান্তের কাছে গিরং এলাকায় একটি বড় ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

তিব্বতের দিক থেকে ধারণ করা একটি নজরদারি ক্যামেরার ভিডিওতে ভয়াবহ দৃশ্য দেখা গেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকতলা উঁচু একটি ভবনের দিকে বিশাল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ ধেয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে সেগুলো ভবনটিকে ঢেকে ফেলে। নিচে থাকা বহু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছিলেন। পানির প্রবল স্রোতে বাস ও গাড়িগুলো খেলনার মতো ভেসে যেতে দেখা যায়।

২৬ আগস্ট প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে আকস্মিক বন্যার পর অন্তত ৩৮০ জন নিখোঁজ হওয়ার কথা জানানো হয়।

দুর্যোগের পর বিশেষজ্ঞরা দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, নদীর ওপর কোথাও পানি আটকে থাকলে সেটি হঠাৎ ভেঙে গিয়ে আবারও বড় ধরনের পানির ঢল নামতে পারে। এতে নতুন করে বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটতে পারে।

নেপালের পুলিশ প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, নদীর পানির প্রবল স্রোত ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রকাশ করা ছবিতে কাদার স্তূপের মধ্যে একটি বাড়ির শুধু ওপরের তলাটি দেখা গেছে। বন্যার প্রবল স্রোত কীভাবে জনবসতি ও অবকাঠামো ধ্বংস করেছে, এসব ছবি ও ভিডিওতে তার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকালে প্রায়ই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস হয়। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এসব দুর্যোগের তীব্রতাও বাড়ছে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টবিষয়ক আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

তিনি এএফপিকে বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনো একটি বাধা আটকে আছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, সেটি ভেঙে গেলে দ্বিতীয় দফায় বন্যা হতে পারে।’

ফলে ভয়াবহ বন্যার প্রথম ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আবারও বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি নদীর উজানে তৈরি হওয়া এই বাধার পরিস্থিতি এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।