২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৪

নেপালে ভয়াবহ বন্যার কারণ জানাল মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থা

নেপালে ভয়াবহ বন্যা  © সংগৃহীত

নেপালে বুধবার সকালে হঠাৎ নেমে আসা ভয়াবহ বন্যার পেছনে কোনো ভূমিকম্প ছিল না। বরং হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল স্তূপ নদীতে নেমে যাওয়ার পর সৃষ্ট প্রবল ধ্বংসাবশেষের স্রোত থেকেই এই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) প্রথমে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে সেই তথ্য সংশোধন করে জানিয়েছে, ওই এলাকায় কোনো ভূমিকম্পই ঘটেনি।

এর আগে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে কাঠমান্ডুর উত্তরে অনুভূত তীব্র কম্পনকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে জানানো হয়েছিল। তবে বুধবার গভীর রাতে ইউএসজিএস জানায়, প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প বলে শনাক্ত হওয়া ঘটনাটি আসলে ছিল হিমবাহ ধস এবং এর ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ ধ্বংসাবশেষের স্রোত।

ইউএসজিএস স্পষ্ট করে বলেছে, 'কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি।'

নেপালের স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে, কাঠমান্ডুর উত্তরে ভূকম্পনের মতো একটি শক্তিশালী কম্পন শনাক্ত হয়। প্রাথমিকভাবে এটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। পরে বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর ইউএসজিএস জানায়, সেটি ভূমিকম্পের কম্পন ছিল না। বরং হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও মাটি বিশাল আকারে নিচের দিকে নেমে আসার কারণেই ওই কম্পনের সৃষ্টি হয়।

স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া প্ল্যানেট ল্যাবসের প্রাথমিক ছবি বিশ্লেষণেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। ছবিতে দেখা যায়, বরফ ও পাথরের একটি বিশাল ভূমিধস লহেন্দে নদীতে নেমে গিয়ে নদীর পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ মিশিয়ে দেয়। এর ফলে নদীতে ভয়াবহ স্রোত তৈরি হয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।

লহেন্দে খোলা নদীটি ভোতে কোশি নদীর একটি শাখা। নদীটি চীন থেকে নেপালের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধসের পর এই নদীপথেই বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে শক্তিশালী স্রোত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

এই আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরে ঘটনাটিকে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ভূমিধস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভূমিধসের ফলে যে কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি ভূমিকম্পের হিসাবে প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার কম্পনের সমতুল্য ছিল।

বন্যার পর নেপালের রাসুয়া ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে।

নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে থাকা এলাকার পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পর কয়েক ঘণ্টা ধরে অন্তত ৪০৩ জন পর্যটকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক।

নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও নিখোঁজ ছিলেন বলে জানিয়েছে নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ।

ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে আটকে থাকা জীবিত মানুষ এবং মরদেহ উদ্ধারে উদ্ধারকারীরা দ্রুত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্গত এলাকায় পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হচ্ছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সরকারের সব ধরনের সম্পদ ও সক্ষমতা ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টার দিকে তিব্বতের দিক থেকে প্রবল স্রোতে পানি ভোতে কোশি নদীতে নেমে আসে। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা, বরফ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষও নেমে আসে। ফলে নদীর স্রোত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং আশপাশের এলাকায় দ্রুত পানি ও কাদার প্রবল স্রোত ছড়িয়ে পড়ে।

নেপালের তিব্বত-সংলগ্ন রাসুয়া ও ধাদিং জেলা এবং নুয়াকোট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে। এসব এলাকায় বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা ও পাথরের স্তূপে যানবাহন ও ঘরবাড়ি চাপা পড়েছে।

নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অংশেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, গিয়েরং এলাকায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে এসব মৃত্যুর তথ্য তখনও যাচাই করা হচ্ছিল এবং একই সঙ্গে সেখানে উদ্ধার অভিযান চলছিল।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি তিব্বত অংশের নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র দেখা গেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বিশাল ঢেউয়ের মতো পাথর, কাদা ও পানির স্রোত নেমে আসার আগে মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত দৌড়ে পালাচ্ছেন। এরপর মুহূর্তের মধ্যে সেই প্রবল স্রোত ভবন ও গাড়িগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা।

বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোট ও ধাদিং এলাকার অনেক মানুষ নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হচ্ছেন। ওই প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকেই দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না, তা জানতে অনেক মানুষ ব্যারাকের গেটের বাইরে অপেক্ষা করছেন। পুলিশও সেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম সংগ্রহ করে তালিকা তৈরি করছে। স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজদের পরিচয় ও সংখ্যা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকার অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে রাতের বেলায় পুরো এলাকা অন্ধকারে থাকছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের অনেক সময় মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের আলো ব্যবহার করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য লিখে রাখতে হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে অসংখ্য বাড়িঘর, গাছপালা ও যানবাহন কাদার নিচে চাপা পড়েছে অথবা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কাদার স্তর এতটাই গভীর যে সেখানে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। দিনভর দুর্গত এলাকার আকাশে হেলিকপ্টার দেখা গেছে। এসব হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে জীবিত মানুষদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

প্রথমে নেপালের ভয়াবহ এই ঘটনাকে ভূমিকম্প হিসেবে মনে করা হলেও ইউএসজিএসের পরবর্তী বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে, সেখানে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। বরং হিমবাহ ধসে বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল স্তূপ নিচে নেমে আসার পর তা নদীতে প্রবল ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি করে। সেই স্রোতই ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে। এর ফলে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে।