১ মার্কিন ডলারে মিলছে ২০ লাখ ইরানি রিয়াল
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতির মধ্যেই ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সোমবার মুদ্রাবাজারে লেনদেন শুরুর সময় এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানের রিয়ালের দাম নেমে গেছে ২০ লাখ ২০ হাজারে। এতে দেশটির অর্থনীতির ওপর চলমান চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
সোমবার মুদ্রাবাজারে লেনদেন শুরুর সময় এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানের রিয়ালের দাম কমে ২০ লাখ ২০ হাজারে নেমে আসে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সরকারি বিনিময় হার অবশ্য প্রতি ডলারে প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল। তবে দেশটির অধিকাংশ মানুষ বাস্তবে বাজারদরেই ডলার কেনাবেচা করেন।
ইরানের মুদ্রার এই দরপতন এমন এক সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আগের নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি করা হবে। এর পাশাপাশি দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর আগেই রিয়াল চাপে ছিল। তখন দেশটি দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতি এবং নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছিল। তবে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে ইরানের রিয়াল বারবার নতুন সর্বনিম্ন দামে নেমেছে।
ইরানের সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাও দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে চালের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশেরও বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হবে।
তবে অর্থনৈতিক চাপ এখনো ইরানের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারেনি। এর পেছনে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলা ও হুমকি দেওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতির পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপরও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে কংগ্রেস নির্বাচন সামনে থাকায় এই পরিস্থিতি তাঁর জন্য আরও চাপ তৈরি করছে।
ফলে যুদ্ধটি এখন অনেকটা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের বাণিজ্যিকভাবে পরিবহন করা মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত। ইরান এখন বলছে, জাহাজ চলাচলের জন্য অর্থ আদায়ের সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত তারা প্রণালিটি পুরোপুরি খুলবে না।
ইরানের বিপরীত পাশে অবস্থিত ওমানের সঙ্গে দেশটির হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে পরিচালনার একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। দুই দেশ এ বিষয়ে চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার ইরান সফর করবেন।
অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন সোমবার আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপরও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা বা সেকেন্ডারি স্যাংশন আরোপের কথা রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে!’
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট রোববার ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-এ প্রকাশিত এক মতামতধর্মী নিবন্ধে লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে রিয়ালের মূল্য কখনো এত দুর্বল ছিল না এবং মূল্যস্ফীতিও খুব কম সময়ই এত বেশি ছিল।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘ইরানি সরকারের শেষ আশ্রয় এখন সেই ভীত দেশগুলোর আত্মপ্রবঞ্চনা, যারা এখনো মনে করে আগ্রাসনের সঙ্গে আপস করলেই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।’
এরই মধ্যে গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। ইউএই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির সবচেয়ে বড় আমদানি উৎসগুলোর একটি।
সোমবার তেহরানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সতর্ক করে বলেন, ‘এই পরিস্থিতির যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে এর পরিণতি ডেকে আনবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের হাত বাঁধা নেই।’
এদিকে জুন মাসে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পাকিস্তান সোমবার ইরানে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনার জন্য এই প্রতিনিধিদল ইরানে গেছে।
তবে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে থাকা ৭৩ বছর বয়সী সাদেক মাহমুদি যুদ্ধের অবসান নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নন। আরও দরপতনের আশঙ্কায় নিজের অবশিষ্ট সঞ্চয় দিয়ে মার্কিন ডলার কিনতে তিনি প্রায় এক ডজন মানুষের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘কোনো চুক্তি ও শান্তির আশা নেই।’