২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৩

এক শিক্ষকেই চলছে ১ লাখ স্কুল, শিক্ষক আছেন—শিক্ষার্থী নেই ৫৬৬৩ স্কুলে

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন   © সংগৃহীত

কোথাও শৌচাগার, কোথাও শিক্ষক সংকট, খেলার মাঠ, রাস্তা— এসব দাবি নিয়ে এবার পথে নামছে ভারতের জেন আলফারা। উত্তরপ্রদেশের হামিরপুরে ৩০০ শিক্ষার্থীর একটি স্কুলের সামনে রাস্তা তৈরির দাবিতে প্রায় ৬ কিলোমিটার মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্কুলশিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, শিক্ষা ব্যবস্থার বড় ছবির আড়ালে এখনও কত ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়ে গিয়েছে।

যন্তর মন্তরের আন্দোলন যেন বুকে বল দিয়েছে। সাহস জুগিয়েছে গোটা দেশের ছাত্রসমাজকে। ধীরে ধীরে সামনে আসছে শিক্ষার্থীরা। কোথাও নিছকই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কচিকাঁচা। তাদের চাহিদা অল্প। একটা শৌচালয়, একজন শিক্ষক কিংবা একটা খেলার মাঠ। সেই দাবি নিয়েই পথে নেমেছে তারা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলগুলিতে এগুলো খুব ছোট অথচ গুরুতর সমস্যা। সেই সব দাবিদাওয়াই এ বার সামনে আসতে শুরু করেছে।

উত্তরপ্রদেশের হামিরপুরের একটি স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০০। স্কুলের সামনে রাস্তা তৈরির দাবিতে ৬ কিলোমিটার মিছিল করে কালেক্টরের দফতরে স্মারকলিপি দিয়েছে তারা। অবরোধ না করে রাস্তার এক পাশ দিয়ে হেঁটেই মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা। লখনউয়ের একটি স্কুলে আবার শিক্ষকের ঘাটতি নিয়ে সরব হয়েছে ২৫০ ছাত্রী। একই ভাবে জয়পুরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা শৌচাগার, নিকাশি এবং শ্রেণিকক্ষের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এমন একাধিক ছবি সামনে আসছে।

তবে রাজ্যভেদে সমস্যার ধরন আলাদা। কোথাও শিক্ষক কম, কোথাও আবার শিক্ষার্থী নেই। ঝাড়খণ্ডে প্রতি ৩৬ জন শিক্ষার্থীর পিছু রয়েছেন একজন শিক্ষক। কর্নাটকে ৮,০৪২টি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন, যা রাজ্যের মোট স্কুলের ১০.৮ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের দাবি, স্কুলগুলিতে আরও শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় বৈষম্য। পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ১৯.৭ শতাংশ স্কুল ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, সব স্কুলে কবে পৌঁছবে ইন্টারনেটের সুবিধা? কেরলের পরিস্থিতি তুলনায় অনেক ভাল। সেখানে ৯২.৬ শতাংশ স্কুলে ইন্টারনেট রয়েছে এবং ৯৯.১ শতাংশ স্কুলে কম্পিউটার রয়েছে। অন্য দিকে, তামিলনাড়ুর স্কুলগুলিতে ডিজিটাল লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে।

‘ইউনিফাইড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস’ (UDISE+) রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে মোট ১৪,৬৬,৬৮২টি স্কুল রয়েছে। এর মধ্যে রাজ্য সরকারের স্কুল ১০,০৩,০৫১টি, কেন্দ্রীয় সরকারের স্কুল ২,১৯৪টি, বেসরকারি অনুদানহীন স্কুল ৩,৪১,৬৮৯টি এবং সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্কুল ৭৯,২৬১টি। দেশে মোট নথিভুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৪.৭ কোটি। শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ১ কোটি। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ২৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক।

কিন্তু এই গড় পরিসংখ্যানের আড়ালেই রয়েছে আরও বড় অসামঞ্জস্য। UDISE+ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১,০০,৮৪৩টি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। অথচ ওই স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৯ লক্ষেরও বেশি। অন্য দিকে, ৫,৬৬৩টি স্কুলে কোনও শিক্ষার্থীই নেই। কিন্তু সেই স্কুলগুলিতে শিক্ষক রয়েছেন ২০,৬৬৭ জন। অর্থাৎ এক দিকে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী মাত্র একজন শিক্ষকের উপর নির্ভরশীল, অন্য দিকে শিক্ষার্থীশূন্য স্কুলে কর্মরত রয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষক।

পরিকাঠামোর ছবিতেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। দেশের সরকারি স্কুলগুলির ৯৫.৩ শতাংশে মেয়েদের ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার রয়েছে। বেসরকারি স্কুলে এই হার ৯৬.৯ শতাংশ। তবে শৌচাগারের মতো মৌলিক পরিকাঠামোর উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষক, ডিজিটাল সংযোগ, শ্রেণিকক্ষ, রাস্তা বা খেলার মাঠের মতো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলিও যে এখনও বহু স্কুলে অধরা, শিক্ষার্থীদের পথে নামার ঘটনাই তার প্রমাণ।

শিক্ষা ব্যবস্থার এই পরিসংখ্যান তাই শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের হিসাব নয়। এক দিকে এক শিক্ষককে নিয়ে চলা এক লক্ষেরও বেশি স্কুল, অন্য দিকে শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীশূন্য হাজার হাজার স্কুল—এই বৈপরীত্যের পাশাপাশি দেশের স্কুলশিক্ষার্থীরা তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলিও নিজেদের মতো করে তুলে ধরছে। ছোট ছোট দাবি নিয়ে পথে নামা এই শিক্ষার্থীরাই যেন শিক্ষা ব্যবস্থার বড় ছবির ফাঁকফোকরগুলি আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে।