এল নিনোর কারণে পানামা খালে জাহাজ চলাচল সীমিত করল কর্তৃপক্ষ
এল নিনোর আবহাওয়া প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া তীব্র খরার কারণে আগামী মাস থেকে পানামা খাল দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা এই কৌশলগত জলপথ নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত জানিয়েছে পানামা খাল কর্তৃপক্ষ। খবর গার্ডিয়ানের
খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খাল সচল রাখতে প্রয়োজনীয় দুটি কৃত্রিম হ্রদে পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়ার কারণে আগামী ৩ সেপ্টেম্বর থেকে দৈনিক জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ৩৬টি থেকে কমিয়ে ৩৪টিতে আনা হবে। পরবর্তীতে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে এই সংখ্যা আরও কমিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩২টি জাহাজে নামিয়ে আনা হবে।
বর্তমানে পুরো মধ্য আমেরিকা অঞ্চলই এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট তীব্র খরার কবলে রয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বায়ু প্রবাহ এবং বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক বিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত খালের ক্যাচমেন্ট এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কমে গেছে এবং এল নিনোর প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত সামনে আরও হ্রাস পেতে পারে।
বিশ্বের প্রায় ৫ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ কনটেইনার পরিবহন এই পানামা খালের ওপর নির্ভরশীল। চীনসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যে বড় খুচরা বিক্রেতা ও জ্বালানি কোম্পানিগুলো খরচ ও সময় বাঁচাতে সাধারণত এই পথটি ব্যবহার করে থাকে।
পরিচালনা পর্ষদ জানিয়েছে, ক্যাচমেন্ট এলাকায় প্রত্যাশার চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় এই জলপথটির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতেই এই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে বৃহৎ আকারের জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ‘ড্রাফট’ বা পানির নিচে জাহাজের নিমজ্জিত অংশের গভীরতা কমিয়ে পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০২৩ সালে কৃত্রিম হ্রদগুলোর পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলে খাল কর্তৃপক্ষ দৈনিক জাহাজ চলাচলের সংখ্যা ৩৮টি থেকে কমিয়ে ২২টিতে নামিয়ে এনেছিল। এর ফলে খালে প্রবেশমুখী হাজারো জাহাজের জট তৈরি হয় এবং পরিবহণকারী কোম্পানিগুলোকে বিকল্প রুট খুঁজতে বাধ্য হতে হয়। বৃহস্পতিবার কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, আগামী দিনে নতুন করে সংখ্যা কমানোর ফলে আগাম বুকিং ছাড়া আসা জাহাজগুলোর অপেক্ষার সময় বহুগুণ বেড়ে যাবে।
সাধারণত, শতকরা ৯০ ভাগ জাহাজ পূর্ব বুকিংয়ের মাধ্যমে খাল পারাপারের সুবিধা গ্রহণ করে এবং বাকি স্লটগুলো নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। ইরান যুদ্ধের আগে এসব নিলামে একটি স্লটের গড় দর ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার, তবে গত এপ্রিলে জট এড়াতে একটি শিপিং কোম্পানি রেকর্ড ৪০ লাখ ডলার পরিশোধ করে একটি স্লট কিনে নেয়। আগামী সপ্তাহের বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে বিধিনিষেধ আরও বাড়ানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত এই খালের প্রধান ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, চিলি এবং দক্ষিণ কোরিয়া। উল্লেখ্য, পানামায় পানি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় কারণ খালের সঙ্গে যুক্ত হ্রদগুলো থেকেই দেশটির মোট ৪২ লাখ জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ খাবার পানি পেয়ে থাকে।
সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দিলেও চলতি বছরের আবহাওয়া পরিস্থিতি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী খরা হিসেবে দেখা দিচ্ছে, যার প্রভাবে গত বুধবার মধ্য আমেরিকার আরেক দেশ হন্ডুরাস তাদের ৮০ শতাংশ অঞ্চলে খরা সতর্কতা জারি করতে বাধ্য হয়েছে।