১৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৬

তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে পারে মিসর: এরদোয়ান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান   © সংগৃহীত

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি সই হওয়া যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসরও যোগ দিতে পারে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি বলেছেন, চুক্তিটি ভবিষ্যতে আরও দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং মিসরের যোগ দেওয়ার বিষয়টি ‘সম্ভব’।

আল জাজিরার আরবি চ্যানেলের ‘আল মুকাবালা’ (দ্য ইন্টারভিউ) অনুষ্ঠানের জন্য দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি রবিবার সন্ধ্যায় প্রচার হওয়ার কথা রয়েছে।

এরদোয়ান বলেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় কোনো একটি সদস্য দেশ বাইরের কোনো পক্ষের হামলার শিকার হলে অন্য সদস্য দেশগুলো একসঙ্গে পদক্ষেপ নেবে।

‘এই চুক্তি বিশ্বের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে,’ বলেন এরদোয়ান। তিনি জানান, ভবিষ্যতে চুক্তির পরিধি বাড়ানোর সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে মিসরের অংশগ্রহণও রয়েছে।

‘মক্কা চুক্তি’ নামেও পরিচিত এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি গত শুক্রবার পবিত্র মক্কা নগরীতে সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই বিধানকে বিশ্লেষকেরা ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করছেন। ন্যাটোর ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই চুক্তিকে ন্যাটোর সমতুল্য বা কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে গঠিত জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কথা বলেন। এর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং সিরিয়া, গাজা ও লেবাননের যুদ্ধ।

হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়াকে তুরস্কের জন্য অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা কারও স্বার্থেই ভালো নয়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বন্ধে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য কাতারের প্রশংসা করেন তিনি।

সিরিয়া, গাজা ও লেবানন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এরদোয়ান বলেন, আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে তুরস্ক তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে একা ছেড়ে যাবে না।

সিরিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তুরস্ক তার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করবে বলে জানান এরদোয়ান। তিনি সিরিয়া সফরের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সিরিয়ার কুর্দিদেরও ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতার অংশীদারিত্ব’ থাকবে।

এরদোয়ান আরও বলেন, তুরস্ক কুর্দি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করবে এবং পুরো অঞ্চলে তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে।

গাজা প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক ‘গাজাকে একা ছেড়ে যেতে পারে না’ এবং গাজার মানুষের পাশে দাঁড়াতে যা প্রয়োজন, তার সবই করবে।

তিনি বলেন, হামাস আন্তরিকভাবে তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো পালন করছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এখনো গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

লেবানন প্রসঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশটিতে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা আঙ্কারার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্ক সফরের সময় লেবাননের যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তিনি ট্রাম্পের কাছে তুলে ধরেছেন বলেও জানান এরদোয়ান।

তিনি বলেন, সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সুদান নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান। তিনি জানান, তুরস্ক সুদানকে সমর্থন দিয়ে যাবে। দেশটির সার্বভৌম পরিষদের প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

লিবিয়া প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, তুরস্কের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক স্থিতিশীল রয়েছে এবং আঙ্কারা লিবিয়াকে পরিত্যাগ করবে না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের সদস্যপদ নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তুরস্ককে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। তবে তিনি বলেন, এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়া আঙ্কারার অগ্রাধিকার নয়।

এরদোয়ান সতর্ক করে বলেন, তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে রাখলে শেষ পর্যন্ত ‘ইউরোপই ক্ষতিগ্রস্ত হবে’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন বলেও জানান এরদোয়ান। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছেন তিনি।

২০১৯ সালে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার পর তুরস্ককে বহুজাতিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল, রুশ এস-৪০০ ব্যবস্থা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের গোপন প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

গত মাসে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনের সময় ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে এরদোয়ান বলেছিলেন, তুরস্কের ওপর আরোপ করা কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভার্সারিজ থ্রু স্যাংশনস অ্যাক্ট বা ‘কাটসা’ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে তার প্রশাসন।

ওই সময় ট্রাম্প আরও বলেছিলেন, তুরস্ককে আবার এফ-৩৫ কর্মসূচিতে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তার প্রশাসন ‘অবশ্যই বিবেচনা করবে’।

তবে তুরস্কের এফ-৩৫ পাওয়ার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ, এ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে বিরোধিতা রয়েছে। পাশাপাশি ২০২০ সালে করা একটি মার্কিন আইনে বলা হয়েছে, তুরস্ক যত দিন এস-৪০০ ব্যবস্থা নিজেদের কাছে রাখবে, তত দিন পেন্টাগন দেশটিকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করতে পারবে না।