গবেষণায় ‘চৌর্যবৃত্তির’ বিতর্কের মধ্যেই ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপকের মরদেহ উদ্ধার
চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ও একাডেমিক কাজ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে থাকা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জেসন আরডের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার দক্ষিণ লন্ডনের ব্যাটারসিয়ার একটি ঠিকানা থেকে তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো। পরে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
৪১ বছর বয়সী আরডে গত সপ্তাহে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠেছিল। পাশাপাশি তাঁর কিছু একাডেমিক অর্জন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে তিনি চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
শুক্রবার এর আগে লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের খবর পেয়ে ব্যাটারসিয়ার ওই ঠিকানায় যায় পুলিশ। মেট্রোপলিটন পুলিশ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই মুহূর্তে তাঁর মৃত্যুকে অপ্রত্যাশিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এতে সন্দেহজনক কোনো বিষয় আছে বলে মনে করা হচ্ছে না।’
আরডের পরিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই অসাধারণ বাবা, সঙ্গী, ভাই, চাচা ও ছেলেকে হারিয়ে আমরা হতবাক।’
পরিবারটি আরও বলেছে, ‘ভুল তথ্য ছড়ানোর এই প্রচারণা জেসনের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। জেসন ছিলেন একজন কোমল মনের মানুষ, যিনি সব সময় সবার মধ্যে ভালো কিছু দেখতে চাইতেন।’
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডেবোরাহ প্রেন্টিস বলেন, ‘এই মর্মান্তিক খবর শুনে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই অত্যন্ত কঠিন সময়ে জেসন আরডের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা।’
শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল বলেন, আরডের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি ‘গভীরভাবে মর্মাহত ও হতবাক’। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, এর সঙ্গে প্রিয়জন থাকা বাস্তব মানুষ জড়িত।’
আরডে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ অস্বীকার করলেও তাঁর কাজের কিছু ভুলের কথা স্বীকার করেছিলেন। গত সপ্তাহে পদত্যাগের সময় তিনি বলেছিলেন, তাঁর কাজ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক তাঁকে ‘নিরবচ্ছিন্ন মাত্রার জনসম্মুখের নজরদারি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের’ মধ্যে ফেলেছিল।
অন্য এক শিক্ষাবিদ নাথান কোফনাস আরডের কাজে চৌর্যবৃত্তির অসংখ্য ঘটনা খুঁজে পাওয়ার দাবি করার পর বিতর্কটি শুরু হয়। কোফনাস নিজেকে ‘জাতিগত বাস্তববাদী’ হিসেবে পরিচয় দেন। ২০২৪ সালে ক্যামব্রিজের একটি পদ থেকে তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।
আরডে বলেছিলেন, তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের একাডেমিক কাজে কিছু ভুল হয়েছিল তাঁর অটিজমের কারণে। তথ্য বোঝার জন্য তিনি অনুকরণের ওপর নির্ভর করতেন বলে এমন ভুল হয়েছিল বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন তিনি। তাঁর দাবি ছিল, একইভাবে অন্য শিক্ষাবিদদের কাজও খুঁটিয়ে দেখলে একই ধরনের ভুল পাওয়া যেতে পারে।
চলতি মাসের শুরুতে টাইমস পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরডে বলেছিলেন, ‘আমরা এখানে একাডেমিয়া নিয়ে কথা বলছি। আমি কাউকে হত্যা করিনি। আমি যে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছি এবং আমাকে এ ধরনের মিথ্যাবাদী ও কল্পনাবিলাসী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’
২০২৩ সালে ৩৭ বছর বয়সে আরডে ক্যামব্রিজের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পান। সে সময় তাঁর নিয়োগকে অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে আরডে বলেছিলেন, তাঁকে নিয়ে চলা তদন্ত ও সমালোচনার ‘ব্যক্তিগত মূল্য’ তাঁর জন্য ‘অনেক বেশি’ হয়ে উঠেছিল।
তিনি বলেছিলেন, ‘সমালোচনা একাডেমিক জীবনের অনিবার্য অংশ। কিন্তু আমি যা অভিজ্ঞতা করেছি, তা একাডেমিক মতবিরোধের অনেক বাইরে চলে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিরলস অভিযোগ, জল্পনা ও জনসম্মুখের মন্তব্য আমার এবং আমার প্রিয়জনদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।’
তবে পদত্যাগের অর্থ তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো বিভিন্ন বক্তব্য তিনি মেনে নিয়েছেন—এমনটি যেন ‘ভুল করে মনে না করা হয়’, সে বিষয়টিও স্পষ্ট করেছিলেন আরডে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় শুরুতে জানিয়েছিল, আরডের পিএইচডি গবেষণাপত্র ও কয়েকটি জার্নালে প্রকাশিত লেখা নিয়ে ওঠা চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ তদন্ত করেছে লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি (এলজেএমইউ) এবং সংশ্লিষ্ট জার্নালগুলো।
২০১৫ সালে আরডেকে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া এলজেএমইউ তদন্ত করে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে তিনি চৌর্যবৃত্তি করেননি।
তবে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর নিয়োগ নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের ঘোষণা দেয়।
সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে উপাচার্য অধ্যাপক ডেবোরাহ প্রেন্টিস বলেন, ‘জেসন আরডের নিয়োগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এবং এর বাইরেও যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারছি এবং আমিও সেই উদ্বেগ ভাগ করে নিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা যেমন বলেছেন, তদন্তটি অবশ্যই বিস্তারিত ও স্বচ্ছ হতে হবে এবং ক্যামব্রিজের ভেতর ও বাইরের জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদদের নিয়ে স্বাধীনভাবে এটি পরিচালনা করা হবে।’
ক্যামব্রিজ আরডের নিয়োগকে একজন তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপকের নিয়োগ হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছিল। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট অধ্যাপকদের মাত্র ১ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ। ফলে এ ধরনের প্রতিটি নিয়োগই সেখানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
আরডের মৃত্যুর পর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে, একজন অধ্যাপককে এমন গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান পদে নিয়োগ দেওয়ার পর তাঁর প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব কতটা ছিল।
এ ঘটনায় বিভিন্ন পক্ষের ক্ষোভও ক্যামব্রিজের দিকে যেতে পারে। একদিকে যারা মনে করেন, আরডেকে প্রকাশ্যে অযথা হয়রানি করা হয়েছে, অন্যদিকে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তাঁকে আদৌ অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত ছিল কি না—দুই পক্ষের চাপই বিশ্ববিদ্যালয়কে সামলাতে হতে পারে।
প্রচারাভিযানকারী সংগঠন গুড ল প্রজেক্টের জোলিয়ন মম বলেন, আরডের মৃত্যু ‘একটি মর্মান্তিক ঘটনা’।
তিনি আরও বলেন, ‘অধ্যাপক পদ থেকে পদত্যাগ করার পরও তাঁকে এভাবে হয়রানি চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে জনস্বার্থ কোথায় ছিল, তা আমি বুঝতে পারছি না। গণমাধ্যমগুলো কী ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছিল, সেটিও আমি বুঝতে পারছি না।’
বিবিসি নিউজনাইটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরডের বন্ধু ও ব্ল্যাক স্টাডিজের অধ্যাপক কেহিন্ডে অ্যান্ড্রুজ বলেন, ক্যামব্রিজ থেকে পদত্যাগের পর আরডে ‘খুব ভেঙে পড়েছিলেন’।
অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘তিনি খুবই বিচলিত ছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, বেরিয়ে আসার কোনো পথ নেই। তিনি কার্যত বাড়ি থেকে বের হতেন না। তিনি অনেক ওজন হারিয়েছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘একাডেমিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষাবিদদের অবস্থা কতটা খারাপ, তা নিয়ে এটি একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।’
লেবার এমপি বেল রিবেইরো-অ্যাডি একই অনুষ্ঠানে বলেন, ‘একজন শিক্ষাবিদকে এভাবে এতটা গণমাধ্যমের নজরদারির মধ্যে টেনে নেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন।’
আরডে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরে এলজেএমইউ থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। এরপর ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক এবং গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন।
আরডের আগের একাডেমিক কাজ নিয়েও গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় একটি পর্যালোচনার ঘোষণা দিয়েছে।
তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়টি এক বিবৃতিতে বলেছে, সাবেক সহকর্মীর মৃত্যুতে তারা ‘হতবাক ও মর্মাহত’।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এই অত্যন্ত দুঃখের সময়ে তাঁর বন্ধু ও পরিবারের প্রতি আমাদের চিন্তা ও গভীর সমবেদনা রয়েছে।’
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ও আরডেকে তাদের সাবেক সহকর্মী হিসেবে স্মরণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি তাঁকে ‘দয়ালু ও উষ্ণ হৃদয়ের মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, তিনি পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করতেন।
গত সপ্তাহান্তে আরডে তাঁর স্মৃতিকথা প্রচারের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বাতিল করেছিলেন।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সাইমন অ্যান্ড শুস্টার জানিয়েছিল, ‘গ্রেট অ্যান্ড আনফরচুনেট থিংস’ নামের তাঁর বইটি যুক্তরাজ্যে ২৭ আগস্ট প্রকাশিত হবে। তবে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই বইটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়েছে।
বইটিতে আরডে তাঁর জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন। তিনি ১১ বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলতে পারতেন না এবং ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত পড়তে বা লিখতে পারতেন না। এরপর নানা ‘অসম্ভব মনে হওয়া সাফল্য ও হৃদয়বিদারক ব্যর্থতার’ মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পান।